Home International আল-আকসায় কট্টরপন্থীদের প্রার্থনা, ফের সংঘাতের আশঙ্কা

আল-আকসায় কট্টরপন্থীদের প্রার্থনা, ফের সংঘাতের আশঙ্কা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
10 views 3 minutes read
A+A-
Reset

জেরুজালেমের অন্যতম স্পর্শকাতর পবিত্র স্থান আল-আকসা চত্বরে ফের উত্তেজনা ছড়াল। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির হাজার হাজার ইহুদি কট্টরপন্থীর সঙ্গে সেখানে প্রবেশ করেন।

সশস্ত্র পুলিশের নিরাপত্তায় তাঁরা প্রার্থনা করেন, ইসরায়েলের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং জাতীয় সঙ্গীত গান।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এই ঘটনা শুধু ধর্মীয় রীতির প্রশ্ন নয়—এটি জেরুজালেমের পবিত্র স্থানকে ঘিরে বহু দশকের পুরনো সমঝোতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

কী এই ‘স্ট্যাটাস কো’?

মুসলমানদের কাছে আল-হারাম আল-শরিফ এবং ইহুদিদের কাছে টেম্পল মাউন্ট নামে পরিচিত এই পবিত্র স্থানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটি দীর্ঘদিনের অলিখিত সমঝোতা রয়েছে, যা ‘স্ট্যাটাস কো’ নামে পরিচিত।

এই ব্যবস্থার অধীনে অমুসলিমরা চত্বরে প্রবেশ করতে পারেন, কিন্তু সেখানে প্রার্থনা করার অধিকার নেই।

ইহুদি দর্শনার্থীদের জন্য প্রার্থনার বই ও ধর্মীয় উপকরণ নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং নিয়মে একতরফা পরিবর্তন আনার মাধ্যমে বেন-গভির ইতিমধ্যেই এই সমঝোতাকে দুর্বল করছেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ।

বৃহস্পতিবারের ঘটনা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিল।

পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, প্রার্থনা

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইহুদি দর্শনার্থীরা আল-আকসা মসজিদ এবং সপ্তম শতাব্দীর ঐতিহাসিক ডোম অব দ্য রকের কাছাকাছি এলাকায় প্রার্থনা করেন।

ইসরায়েলের লিকুদ দলের সংসদ সদস্য আমিত হালেভিও একটি দলের সঙ্গে সেখানে যোগ দেন। তাঁরা ইসরায়েলের পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

ইসরায়েলি দৈনিক ‘হারেৎজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে এমন সংগঠনগুলিও অংশ নেয়, যারা টেম্পল মাউন্টে ইহুদিদের নিয়মিত উপাসনার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে।

বেন-গভির পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “এখানে আমরা বিশাল অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। ইহুদিরা এখন এখানে প্রার্থনা করছেন এবং নিজেদের এই স্থানের মালিক বলে অনুভব করছেন।”

এর আগেও তিনি আল-আকসা চত্বরে ইসরায়েলের পতাকা উত্তোলন এবং সেখানে একটি সিনাগগ নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

তিশা বি’আভে বাড়ল উত্তেজনা

বৃহস্পতিবার ছিল ইহুদিদের ধর্মীয় শোক দিবস তিশা বি’আভ।

এই দিনে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকে নির্মিত প্রথম ইহুদি মন্দির এবং খ্রিস্টাব্দ ৭০ সালে রোমানদের হাতে ধ্বংস হওয়া দ্বিতীয় মন্দিরের স্মরণে শোক পালন করা হয়।

এই ধর্মীয় আবেগের দিনেই আল-আকসা চত্বরে ইহুদিদের প্রকাশ্য প্রার্থনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

ফিলিস্তিনি ধর্মীয় ওয়াকফ এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, এই পদক্ষেপ “পুরো অঞ্চলজুড়ে একটি ধর্মীয় যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা”।

অতীতও দিচ্ছে সতর্কবার্তা

আল-আকসা চত্বরে ‘স্ট্যাটাস কো’ বদলের চেষ্টা অতীতেও বড় সংঘাতের সূত্রপাত করেছে।

২০০০ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি বিরোধী নেতা এরিয়েল শ্যারনের বিতর্কিত সফরের পরই দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা শুরু হয়েছিল। সেই সংঘাত প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলেছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার নামও ছিল ‘আল-আকসা ফ্লাড’। হামাসের দাবি ছিল, জেরুজালেমের এই পবিত্র স্থানে ইসরায়েলের পদক্ষেপও তাদের হামলার অন্যতম কারণ।

এই ইতিহাসের কারণেই বৃহস্পতিবারের ঘটনাকে নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা।

ইসরায়েলি শান্তিকামী সংগঠন ‘পিস নাউ’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, আল-আকসা ও ডোম অব দ্য রকের আশপাশে প্রার্থনা করা “একটি বিপজ্জনক উসকানি”।

সংগঠনটির অভিযোগ, এই ঘটনা সেই ভঙ্গুর ‘স্ট্যাটাস কো’-কে সরাসরি লঙ্ঘন করছে, যেখানে অমুসলিমদের প্রার্থনা নিষিদ্ধ।

জর্ডানের তীব্র নিন্দা

ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জর্ডানও।

জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে, জেরুজালেমের ইসলামি ও খ্রিস্টান পবিত্র স্থানগুলির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কথিত লঙ্ঘন বন্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

আল-আকসা চত্বরের আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক ইসলামিক ওয়াকফের দাবি, বৃহস্পতিবার সকালে ৩,২২৮ জন ইসরায়েলি চত্বরে প্রবেশ করেন। পরে আরও কয়েক হাজার মানুষের প্রবেশের সম্ভাবনা ছিল।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আল-আকসায় ইহুদিদের প্রার্থনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, বেন-গভিরের আনা পরিবর্তনগুলি তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছে।

যদিও সমালোচকদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু সরকার কার্যত ‘স্ট্যাটাস কো’-র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুর্বল করে দিয়েছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পুরনো জেরুজালেমেও সংঘর্ষ

এদিকে বৃহস্পতিবার ভোররাতে পুরনো জেরুজালেমে আল-আকসা চত্বরের আশপাশে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন।

অভিযোগ, মিছিলকারীদের মধ্যে কয়েকজন ফিলিস্তিনিদের উপর হামলা চালান এবং লায়ন্স গেটের কাছে একটি মুসলিম কবরস্থান ভাঙচুর করেন।

সহিংসতার অভিযোগে ১৬ জন ইহুদি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আল-আকসা চত্বরকে ঘিরে প্রতিটি পদক্ষেপই তাই এখন শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়।

এটি জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

আর ‘স্ট্যাটাস কো’ যদি সত্যিই ভেঙে পড়ে, তবে তার অভিঘাত আল-আকসার চত্বরেই থেমে থাকবে না—ফের আগুন ছড়াতে পারে গোটা অঞ্চলে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles