বাংলাস্ফিয়ার: দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল চিকিৎসা শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর যুবসমাজের ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। রাস্তায় নেমেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছাত্রছাত্রীরা। প্রশ্ন উঠছে—শুধু প্রশ্নফাঁসই কি এই বিস্ফোরণের কারণ, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট?

পরিসংখ্যান বলছে, এই ক্ষোভের শিকড় ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্যে। শিক্ষিত হওয়ার পরও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকা, দক্ষতা ও চাকরির চাহিদার মধ্যে ফারাক এবং সীমিত সংখ্যক সরকারি চাকরির জন্য বিপুল প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর হতাশা।

ভারতে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার প্রসার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও পেশাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। কিন্তু একই গতিতে বাড়েনি মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান। ফলে শিক্ষার বিস্তার যেমন ঘটেছে, তেমনি বেড়েছে শিক্ষিত বেকারত্বও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভারতের শ্রমবাজারে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে বহু সংস্থা দক্ষ কর্মীর অভাবের কথা বলছে, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবক-যুবতী উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। অর্থাৎ সমস্যা শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, শিক্ষার প্রকৃতি ও বাজারের চাহিদার মধ্যকার অমিলও।

সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা সরকারি চাকরি। সীমিত সংখ্যক পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা এখন প্রায় অবিশ্বাস্য। একটি সাধারণ গ্রুপ-সি বা গ্রুপ-ডি পদে লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়ছে। বহু ক্ষেত্রে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি গবেষণারত শিক্ষার্থীরাও নিম্নপদের চাকরির জন্য আবেদন করছেন। পরীক্ষার ক্যালেন্ডারে বিলম্ব, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে মামলা এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও চাপ ক্রমশ বেড়েছে। চিকিৎসা, প্রকৌশল, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি নিয়োগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা বহুগুণ বেড়েছে। একটি পরীক্ষায় সামান্য অনিয়ম বা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বহু বছরের পরিশ্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ দ্রুত বৃহত্তর অসন্তোষে রূপ নেয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষোভের আরেকটি কারণ প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান। পরিবারগুলি শিক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কোচিং, আবাসন, পরীক্ষার ফি, বইপত্র—সব মিলিয়ে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বহু পরিবারকে বড় আর্থিক চাপ নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা মনে করেন, কঠোর পরিশ্রমের পর অন্তত একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা তাঁরা পাবেন। যখন সেই ব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন ওঠে, তখন ক্ষোভ শুধু প্রশাসনের বিরুদ্ধে নয়, গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তৈরি হয়।

শ্রমবাজারের আরেকটি বাস্তবতা হল ‘আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট’ বা যোগ্যতার তুলনায় কম মানের কাজ করতে বাধ্য হওয়া। বহু উচ্চশিক্ষিত যুবক এমন কাজে যুক্ত হচ্ছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজনই নেই। এতে ব্যক্তিগত আয় যেমন সীমিত থাকে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গ্রামীণ ও শহুরে যুবকদের অভিজ্ঞতাতেও পার্থক্য রয়েছে। শহরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও প্রতিযোগিতাও তীব্র। অন্যদিকে ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে ভালো মানের চাকরির সুযোগ সীমিত হওয়ায় বহু শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বড় শহরে চলে আসেন। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, কিন্তু কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে না।

নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সমস্যা আরও জটিল। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়লেও কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। নিরাপত্তা, সামাজিক বাধা, কর্মক্ষেত্রের সীমিত সুযোগ এবং পারিবারিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে বহু শিক্ষিতা নারী শ্রমবাজারে টিকে থাকতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা আরও বেশি ডিগ্রি সমস্যার সমাধান নয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিল্প, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, উৎপাদন এবং পরিষেবা খাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাতেও স্বচ্ছতা ও সময়নিষ্ঠা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা, দ্রুত ফল প্রকাশ, সময়মতো নিয়োগ এবং প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে যুবসমাজের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কারণ একটি পরীক্ষার অনিয়ম এখন আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; তা গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

বর্তমান ছাত্র আন্দোলন তাই কেবল একটি প্রশ্নপত্র বা একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, যারা বিশ্বাস করে শিক্ষা তাদের উন্নতির পথ হবে, কিন্তু বাস্তবে সেই পথ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত না হলে এই ক্ষোভ ভবিষ্যতেও নতুন নতুন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামনে আসতে পারে।

অর্থাৎ, প্রশ্নফাঁস ছিল হয়তো স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু আগুনের জ্বালানি জমে ছিল বহু বছর ধরে—অপূর্ণ প্রত্যাশা, শিক্ষিত বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভেঙে পড়া আস্থার স্তরে স্তরে। সেই বাস্তবতাকেই আজ দেশের ছাত্র-যুব সমাজ নতুন ভাষায় প্রকাশ করছে।