বাংলাস্ফিয়ার: নিট-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আন্দোলন যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই তীব্র হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে সংসদ চলো কর্মসূচি পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, আটক, নজরদারি, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ এবং ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্র কত দূর যেতে পারে?

এই বিতর্কের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে আদালত। রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে সংসদে সমাধান না মিললেও বিচারব্যবস্থা বারবার হস্তক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। ফলে এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ভারতের গণতন্ত্রে প্রতিবাদের পরিসর অনেক সময় সংসদের চেয়ে আদালতেই বেশি সুরক্ষা পায়।

প্রথম থেকেই দিল্লি পুলিশ যুক্তি দিয়েছে, রাজধানীর নিরাপত্তা, সংসদের অধিবেশন এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। পুলিশের দাবি, কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর উপর আক্রমণ চালান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই কারণেই আটক, রাস্তা বন্ধ, নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

কিন্তু আন্দোলনকারীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ মিছিলের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অকারণে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং বিরোধী মতকে দমন করার জন্য প্রশাসন অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে। বহু ছাত্র, গবেষক ও চিকিৎসক সংগঠনও দাবি করেছে, প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারকে আইনশৃঙ্খলার অজুহাতে সংকুচিত করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আদালতের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। দিল্লি হাই কোর্ট একাধিকবার প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হয়েছে এবং আটক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তি কী। বিশেষ করে অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের চিকিৎসা, তাঁকে কোথায় রাখা হবে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার—এসব ক্ষেত্রে আদালত সরাসরি নজরদারি করেছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতিও শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশেই সম্ভব হয়।

আদালতের এই অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতিকে সামনে আনে। ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) এবং ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদ নাগরিককে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার দেয়। অবশ্য এই অধিকার সম্পূর্ণ অবাধ নয়। জনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনস্বার্থে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ অবশ্যই প্রয়োজনীয়, অনুপাতগত এবং বৈধ হতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের পদক্ষেপ উদ্দেশ্যের তুলনায় অতিরিক্ত হতে পারে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। একই সঙ্গে আদালত এটাও স্পষ্ট করেছে যে, প্রতিবাদের নামে জনজীবন সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়া বা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ জনপথ দখল করে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি দুই দিকেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে—প্রতিবাদের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনই প্রশাসনেরও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব রয়েছে।

সিজেপি আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিতর্কের বড় অংশটি এই ‘অনুপাতগত বলপ্রয়োগ’ ঘিরেই। যদি কোনও মিছিল নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড যথেষ্ট হয়, তবে লাঠিচার্জ কি অপরিহার্য? যদি সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট হয়, তবে ইন্টারনেট বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ কি যুক্তিযুক্ত? যদি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকে, তবে ব্যাপক আটক কি শেষ বিকল্প হওয়া উচিত? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে।

রাজনৈতিকভাবে সরকার সংসদে বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীরা অনড় থেকেছে, অন্যদিকে সরকারও নিজেদের অবস্থান থেকে সরেনি। ফলে আলোচনার রাজনৈতিক পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সেই শূন্যস্থানেই বিচারব্যবস্থা একটি ন্যূনতম সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা নিয়েছে।

এই পর্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আদালত সরাসরি আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবি বিচার করছে না। প্রশ্নফাঁস, শিক্ষানীতির ব্যর্থতা বা মন্ত্রীর পদত্যাগ—এসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের মৌলিক অধিকার, চিকিৎসা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের বৈধতা বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। ফলে আদালত মূলত সাংবিধানিক সীমারেখা নির্ধারণ করছে, রাজনৈতিক সমাধান নয়।

ভারতের গণতন্ত্রে প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রের সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু সিজেপি আন্দোলন আবারও দেখিয়ে দিল, এই সংঘাতের চূড়ান্ত বিচার অনেক সময় সংসদে নয়, আদালতেই হয়। সরকার আইনশৃঙ্খলার যুক্তি তুলে ধরে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে, আন্দোলনকারীরা অধিকারের প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তি কতটা বৈধ এবং কতটা অতিরিক্ত—সেই সীমারেখা নির্ধারণের দায়িত্ব বিচারব্যবস্থার ওপরই এসে পড়ে।

সিজেপি আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রে নাগরিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরও প্রতীক।