বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশনে বুধবার নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। বিরোধী আসনে বসা তৃণমূল কংগ্রেসের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সংঘাতে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় অধিবেশন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট নিয়ে আলোচনার সময় বক্তব্য রাখতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ তীব্র প্রতিবাদ জানান। এরপরই স্পিকার রথীন্দ্র ঘোষ তাঁকে এক দিনের জন্য সাসপেন্ড করেন। মার্শালরা তাঁকে বিধানসভা কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যান।

ঘটনার পর কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের চিফ হুইপ আখরুজ্জামান, যিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠীর নেতা, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে বক্তব্য রাখতে দেননি। তাঁর দাবি, “আমাকে বলা হয়েছে, উপরমহলের নির্দেশে আমাকে বলতে দেওয়া হবে না। জানতে চাই, সেই উপরমহল কে? বিরোধী দলনেতা, না তাঁর বিজেপি অভিভাবক?”

কুণাল ঘোষের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট নিয়ে আলোচনায় সাম্প্রতিক পুলিশি পদক্ষেপ, তৃণমূল কর্মীদের ওপর অত্যাচার এবং নারী নির্যাতনের মতো বিষয়গুলি তিনি তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে এমন বিষয় এড়াতেই তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বক্তব্য রাখতে না পারলে শেষ হয়ে যাবে না। কিন্তু একজন বিধায়ক হিসেবে কথা বলার অধিকার আমার আছে। আমাকে এভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া যায় না।”

সংবাদ সম্মেলনে কুণাল ঘোষ বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের ‘বিজেপির পুতুল’ বলে আক্রমণ করেন। তাঁর ভাষায়, “এরা বিরোধী নয়, বিজেপির বি-টিম। সরকার যেভাবে নির্দেশ দেয়, সেভাবেই চলে। প্রকৃত ইস্যু থেকে নজর ঘোরাতেই এমন ডামি বক্তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যাতে বিজেপি ফাঁকা মাঠে গোল করতে পারে।”

কুণাল ঘোষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রবীণ তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় স্পিকারের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি স্পিকারের কাছে গিয়েছিলেন এবং সদস্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু স্পিকার নাকি তাঁদের বলেছেন, “আপনারা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে নিন।” শোভনদেবের মতে, বিধানসভার অভিভাবক হিসেবে স্পিকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেট বিতর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন বামফ্রন্ট ও তৃণমূল—দুই সরকারেরই তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও তারা পুলিশ পরিকাঠামোর উন্নতি বা আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভেন্দু বলেন, “ভাইপো-সমর্থক তৃণমূলের নাম-চিহ্ন পশ্চিমবঙ্গে থাকবে না। এটা আমার দায়িত্ব।”

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, “ও বাঘ নয়, বিড়াল। ওর প্রতিটি দুর্নীতির হিসাব আমি বের করে আনব।” নাম না করেই মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, “তুমি প্রতিষ্ঠিত চোর—এটা আমি তোমার জীবদ্দশাতেই প্রমাণ করব।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এক জনসভা থেকে তিনি বলেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তৃণমূলকে দুর্বল করা যাবে না। আমি কথা দিচ্ছি, বাংলার মাটি থেকে বিজেপিকে উৎখাত করব। জেলে পাঠাতে চাইলে পাঠাক, মিথ্যা মামলা দিক, তবুও মাথা নত করব না। আমার মেরুদণ্ড বিক্রির জন্য নয়।”

বিধানসভার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বিরোধী শিবিরে থাকা তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর প্রকাশ্য সংঘর্ষ শুধু রাজনৈতিক অস্বস্তিই বাড়ায়নি, বিধানসভার কার্যপ্রণালী নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

এদিনই রাজ্য সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের ঘোষণাও করে। ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মধ্যেই চার সদস্যের এই কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় শুভেন্দু অধিকারী সরকার। তবে সেই ঘোষণাও বিধানসভার নাটকীয় সংঘাতের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

বুধবারের অধিবেশন স্পষ্ট করে দিল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন শুধু সরকার বনাম বিরোধী নয়, তৃণমূল বনাম তৃণমূলের লড়াইও সমান তীব্র। সেই সংঘাতের অভিঘাত এবার বিধানসভার অন্দরেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল।