২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো মাঠের ফুটবল নয়, বরং ফিফার ব্যবসায়িক মডেলের আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠা।
ফিফাকে ভালোবাসতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা কঠিন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ঠিক যেভাবে সফল হওয়ার জন্য পরিকল্পিত ছিল, সেভাবেই সফল হয়েছে। মাঠে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও নাটকীয় ফুটবল, দর্শকের বিপুল উপস্থিতি, অঘটনের রোমাঞ্চ, আন্ডারডগদের গল্প এবং কোটি কোটি ডলারের আয়। এমনকি ফিফার নিজের পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে গেছে এই টুর্নামেন্টের রাজস্ব।
এই বিশ্বকাপ আরেকটি বিতর্কিত বিষয়কেও অনেকটাই স্বাভাবিক করে তুলেছে—বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। প্রথমে যা দর্শকদের বিরক্তির কারণ ছিল, ভবিষ্যতে তা হয়তো আর কারও চোখেই পড়বে না। ফিফা দাবি করলেও যে এসব বিরতি থেকে অতিরিক্ত আয় হয়নি, সম্প্রচার সংস্থাগুলোর জন্য এর বাণিজ্যিক মূল্য ভবিষ্যতের টিভি-স্বত্ব চুক্তিতে অবশ্যই বিবেচনায় আসবে।
৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপও প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নতুন অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বেশিরভাগই প্রত্যাশার চেয়ে ভালো খেলেছে। ফলে এখন ৬৪ দলের বিশ্বকাপের ধারণাও আর অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে না; বরং ফিফার নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় তা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ফিফা যা চেয়েছিল, প্রায় সবই ঘটেছে।
এই বিশ্বকাপ ছিল অনেকটাই ‘আমেরিকান ধাঁচের’। কাউন্টডাউন, হাফটাইম শো, চ্যাম্পিয়নশিপ রিং, বিজ্ঞাপনের বিরতি, ম্যাচ শুরুর আগে বিনোদনমূলক ঘোষক, নির্ধারিত সময়ে খেলা শুরু না হওয়া, ডায়নামিক টিকিট মূল্য—সবই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতি থেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর বিনিময়ে স্বাগতিক দেশগুলো কী পেল?
একসময় ফিফা বলত, বিশ্বকাপের উদ্দেশ্য নতুন দেশে ফুটবলকে জনপ্রিয় করা। কিন্তু এই বিশ্বকাপ কি সত্যিই উত্তর আমেরিকায় ফুটবলের নতুন ভিত্তি গড়ে দিল? কয়েক বছর পর এই টুর্নামেন্টকে মানুষ কীভাবে মনে রাখবে?
তিনটি স্বাগতিক দেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
মেক্সিকো তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করে সন্তুষ্টই থাকবে। তাদের জাতীয় দল অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত নকআউট পর্বে এগোলেও শেষ পর্যন্ত আগের মতোই শেষ ষোলোতেই থেমে যায়।
প্রথমবারের স্বাগতিক কানাডা মাঠে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নিলেও তারা বিশ্বকে একটি সফল ও প্রাণবন্ত আয়োজন উপহার দিয়েছে।
সবচেয়ে জটিল প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে।
এই বিশ্বকাপ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। টিকিটের দাম এত বেশি ছিল যে নতুন দর্শক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই সীমিত হয়ে পড়ে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফিফার আয়ের প্রায় পুরোটা সুইজারল্যান্ডে ফিরে যাবে। ১৯৯৪ সালের মতো স্থানীয় ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করার জন্য কোনো উদ্বৃত্ত তহবিল থাকছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনও আয়োজনের মূল কাঠামো থেকে অনেকটাই বাইরে ছিল।
টেলিভিশনে অবশ্য বিপুলসংখ্যক মানুষ বিশ্বকাপ দেখেছেন। কিন্তু তাঁরা কতজন সত্যিই ফুটবলের স্থায়ী সমর্থকে পরিণত হবেন, তা জানতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
লেখকের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার মাঠের স্মৃতি নয়; বরং এমন একটি মডেল, যেখানে ফিফা বিপুল অর্থ উপার্জন করে, অথচ স্বাগতিক দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। এই সাফল্যই ভবিষ্যতে আরও বড়, আরও বাণিজ্যিক এবং আরও বিস্তৃত বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।