হাইলাইটস:

  • পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের পরও দিল্লিতে হাজারো বিক্ষোভকারী আবার রাস্তায়।
  • শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
  • আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি আর শুধু পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নয়, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই।
  • বিরোধী কংগ্রেসও আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগ দাবি করেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির যন্তর মন্তরে মঙ্গলবারও ছিল মানুষের ঢল। আগের দিনের পুলিশি লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, ব্যারিকেড এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও তরুণদের দমাতে পারেনি। বরং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ তাঁদের আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের জন্য জবাবদিহি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন গত এক মাস ধরে চলছে, তা এখন নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেতে শুরু করেছে।

২৫ বছর বয়সি তরু এবার বিক্ষোভস্থলে এসেছেন বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে। এক হাতে সরকারের বিরুদ্ধে লেখা পোস্টার, অন্য হাতে হেলমেট।

তিনি বলেন, “এবার প্রস্তুত হয়েই এসেছি। যদি দিল্লি পুলিশ আবার আমাদের মারধর করে, তাহলে অন্তত মাথাটা রক্ষা করতে পারব। আমরা ভয় পাই না। যতই ওরা হামলা করুক, আমরা পালাব না। সরকার কথা না শোনা পর্যন্ত এখানেই থাকব।”

মঙ্গলবার মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তর ও তার আশপাশে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল। ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় গণবিক্ষোভের এই দৃশ্য দেখে স্পষ্ট, আন্দোলনের গতি কমার কোনও লক্ষণ নেই।

এর মাত্র এক দিন আগে, সোমবার, ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ দিল্লির রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থী। নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আহ্বানে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে মিছিল করেছিলেন।

শান্তিপূর্ণ জমায়েত থেকে সংঘর্ষ

সোমবার দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল শান্ত। তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা একে অপরকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন, খাবার ভাগ করে খাচ্ছিলেন, স্লোগান দিচ্ছিলেন।

কিন্তু বিকেলের দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়।

বিক্ষোভকারীদের সংসদের দিকে অগ্রসর হতে দেয়নি দিল্লি পুলিশ। দ্রুত বাড়তে থাকা জনতাকে একটি সীমিত এলাকায় আটকে রাখা হয়। রাজধানীর নানা জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়, মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ।

পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের উসকানিমূলক আচরণের জবাব দিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আন্দোলনের সংগঠক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, কোনও উসকানি ছাড়াই পুলিশ হামলা চালায়। তাঁদের অভিযোগ, নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি।

এই সংঘর্ষে প্রায় ৬০ জন আহত হন। অন্তত একজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভেন্টিলেটরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে আন্দোলনকারীরা জানান।

‘এটাই সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল’

তরু জানান, বিকেল তিনটার পর হঠাৎ পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

“পুলিশ নির্বিচারে মারতে শুরু করে। আমি নিজের চোখে দেখেছি, ফুটপাতে শান্তভাবে বসে থাকা মানুষদের মাথায় লাঠি মারা হচ্ছে। আমরা যখন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছি, তখন আমাদের দিকে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়।”

তাঁর মতে, দিল্লি পুলিশের এই পদক্ষেপ সরকারের জন্য বড় ভুল হয়ে গেছে।

“এখন আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুব্ধ। আমাদের দমিয়ে দেওয়ার বদলে এই হামলাই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।”

যন্তর মন্তরে ফের জনসমুদ্র

মঙ্গলবারও দিল্লি পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন সত্ত্বেও যন্তর মন্তরে মানুষের ভিড় কমেনি।

স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। শিক্ষামন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের দাবিও জোরালোভাবে উঠতে থাকে।

অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দিল্লিতে পৌঁছেছেন।

২৩ বছর বয়সি রণজিৎ বর্মা বলেন,

“সরকারকে বুঝতে হবে, আমরা কোথাও যাচ্ছি না। আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।”

কংগ্রেসও মাঠে

এই আন্দোলনের আবহকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বিরোধী কংগ্রেসও।

মঙ্গলবার দিল্লিতে পৃথক কর্মসূচি পালন করে কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে মোদী সরকার। সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগ করা উচিত।

যদিও আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা সিজেপি নিজেদের স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখেছে এবং মূল দাবি হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারকেই সামনে রাখছে।

শিক্ষা ছাড়িয়ে বৃহত্তর অসন্তোষ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিজেপি মূলত প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন করছিল।

কিন্তু সোমবারের ঘটনায় অনেকের মতে আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

দিল্লির ২৬ বছর বয়সি কনটেন্ট নির্মাতা কুহু কৌশিক বলেন,

“গতকাল রাস্তায় যে সংহতি দেখেছি, তা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ১৪ বছরের ছেলেমেয়েদের পুলিশ মারছে—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু এই ঘটনাই আমার মধ্যে নতুন একটা চেতনা জাগিয়ে তুলেছে।”

তিনি আরও বলেন,

“সেই কারণেই আজ আবার ফিরে এসেছি। সরকার আমাদের কথা না শোনা পর্যন্ত আমরা সরে যাব না। এখন বিষয়টা শুধু শিক্ষা নয়, আরও অনেক বড় হয়ে উঠছে। তবে আমরা ধাপে ধাপে এগোতে চাই।”

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরও মত, ভারতের ৬০ কোটিরও বেশি তরুণ-তরুণীর মধ্যে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। কর্মসংস্থান, পরীক্ষায় অনিয়ম, সরকারি নিয়োগে বিলম্ব, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—সব মিলিয়ে এটি বৃহত্তর অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

নেতৃত্বের সতর্ক কৌশল

মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ঘোষণা করেন, আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

তবে এই জনসমর্থনকে পরবর্তী পর্যায়ে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনও কর্মসূচি ঘোষণা করেননি।

আন্দোলনের মুখপাত্র রত্না সিং বলেন, গত ১২ বছরে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যে সব বড় আন্দোলন হয়েছে, সেগুলির বিরুদ্ধে কীভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁদের পূর্ণ ধারণা রয়েছে।

তাঁর কথায়,

“এই সরকারের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কখনও সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার হয়েছে, কখনও কর দপ্তরের অভিযান হয়েছে, আবার কেউ জেলে গিয়েছেন। মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবুও এত মানুষ রাস্তায় নেমেছেন—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।”

তিনি আরও বলেন,

“পুলিশ আমাদের প্রতি কোনও দয়া দেখায়নি। কিন্তু যতই বর্বর আচরণ করা হোক না কেন, আমাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা যাবে না।”

সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন

সোমবার সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সিজেপির দুই প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেখানে আন্দোলনকারীদের দাবি নিয়ে আলোচনা হয়।

কিন্তু মঙ্গলবার আর কোনও সরকারি যোগাযোগ হয়নি বলে দাবি করেছেন আন্দোলনের নেতারা।

রত্না সিংয়ের অভিযোগ, “প্রধানমন্ত্রী এখনও পর্যন্ত যা ঘটেছে, সে বিষয়ে একটি কথাও বলেননি।”

তিন প্রজন্মের অংশগ্রহণ

মঙ্গলবারের বিক্ষোভে শুধু তরুণরাই ছিলেন না। বিভিন্ন বয়সের মানুষও যোগ দিয়েছেন।

৮০ বছর বয়সি শোভা বর্মা তাঁর নাতনিকে নিয়ে যন্তর মন্তরে এসেছিলেন।

তিনি বলেন,

“বহু বছর ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণদের সঙ্গে অবিচার করেছে। কিন্তু আজ এখানে এত মানুষকে একসঙ্গে দেখে আমার নতুন করে আশা জাগছে। মনে হচ্ছে, আগামী প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করতে শিখেছে।”

দিল্লির যন্তর মন্তরে চলতে থাকা এই আন্দোলন আপাতত থামার কোনও লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং পুলিশি দমনপীড়নের পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে যে নতুন ঐক্য ও দৃঢ়তা তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতে এই আন্দোলনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করতে পারে।