হাইলাইটস
- ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে সরিয়ে নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতিকে নিয়োগ জেলেনস্কির।
- প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত মিখাইলো ফেদোরভকে সরকারের একটি “গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব” দেওয়ার প্রস্তাব।
- ফেদোরভকে সরানোর প্রতিবাদে কিয়েভ-সহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের পরেই এই বড় রদবদল।
- সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন, ড্রোন যুদ্ধ এবং দূরপাল্লার হামলায় আরও জোর দেওয়ার পরিকল্পনা।
- দীর্ঘ যুদ্ধের আবহে নতুন সেনাপ্রধানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—সেনা সংগ্রহ ও প্রতিরক্ষা কৌশলে সংস্কার।
ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে বড়সড় রদবদল করলেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিকে নিয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরানো মিখাইলো ফেদোরভকে সরকারে একটি “গুরুত্বপূর্ণ পদ” দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন জেলেনস্কি।
মঙ্গলবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, দ্রাপাতির নেতৃত্বে দেশের সামরিক কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। যুদ্ধের বদলে যাওয়া বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে আরও দ্রুত, কার্যকর এবং আধুনিক করে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
সিরস্কির বিদায়েও তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন জেলেনস্কি। কিয়েভ রক্ষার যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের পাল্টা অভিযানে সিরস্কির ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। জেলেনস্কির কথায়, “আমরা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছি। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি সৈনিকই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।”
তবে এই রদবদলের পেছনে রাজনৈতিক চাপও কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফেদোরভকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর প্রতিবাদে কিয়েভ-সহ একাধিক শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নামেন। আন্দোলনকারীরা তাঁকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে শুক্রবারের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে অনির্দিষ্টকালের আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছিলেন।
নতুন সেনাপ্রধান দ্রাপাতির নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন ফেদোরভ। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত “পরিবর্তনের নতুন আশা” তৈরি করেছে। তবে ইউক্রেনের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে যুদ্ধ শেষ করার একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা, শক্তিশালী নেতৃত্ব, সেনাদের জীবন রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধেই এখন বিশেষ জোর দিতে চাইছে কিয়েভ। জেলেনস্কি জানান, দ্রাপাতির সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল শোধনাগার-সহ সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন। তাঁর কথায়, ইউক্রেনের “নির্ভুল আঘাতের কর্মসূচি” আরও জোরদার করা হবে।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত দ্রাপাতি। ২০১৪ সালে ডনবাসে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তিনি বিশেষ পরিচিতি পান। মারিউপোলে সাঁজোয়া গাড়ি ব্যবহার করে রুশপন্থী জঙ্গিদের ব্যারিকেড ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় তাঁর নাম সামনে আসে। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম তাঁকে দেশের অন্যতম দক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য নতুন সেনা সংগ্রহ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে প্রতিরক্ষা কৌশল হালনাগাদ করার পাশাপাশি মোবিলাইজেশন ব্যবস্থায় সংস্কারও নতুন সেনাপ্রধানের অন্যতম প্রধান কাজ হতে চলেছে।
অন্যদিকে, ফেদোরভকে ঠিক কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পদে ইতিমধ্যেই সাবেক বিশেষ অভিযান বাহিনীর কমান্ডার ইয়েভহেন খমারাকে নিয়োগ করা হয়েছে।
জেলেনস্কি জানান, ফেদোরভের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে এবং তাঁকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি দেশের প্রযুক্তি খাতকে একত্রিত করে তার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
জেলেনস্কির বার্তা স্পষ্ট—সামরিক নেতৃত্বে বদল হলেও লক্ষ্য বদলায়নি। রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে মস্কোকে শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করাই কিয়েভের প্রধান উদ্দেশ্য।