Table of Contents
আলাস্কার আদিবাসী ক্রীড়ার ঐতিহ্য আজও অমলিন
হাইলাইটস
- শতাব্দীপ্রাচীন আর্কটিক খেলার ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন আলাস্কার আদিবাসীরা।
- ৫৭ বছরেও প্রতিযোগিতায় নামছেন বিশ্বরেকর্ডধারী ইনুপিয়াক ক্রীড়াবিদ নিকোল জনসন।
- শিকার ও বেঁচে থাকার দক্ষতা থেকেই জন্ম এসব খেলার, যা আজ আদিবাসী সংস্কৃতির পরিচয়ের প্রতীক।
- অলিম্পিকের মঞ্চে আর্কটিক খেলাকে তুলে ধরাই এখন নতুন প্রজন্মের বড় স্বপ্ন।
বরফ, তুষার আর হিমেল বাতাসের দেশে খেলাধুলা মানেই শুধু প্রতিযোগিতা নয়—এটি ইতিহাস, পরিচয় এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আলাস্কার আদিবাসীদের শতাব্দীপ্রাচীন আর্কটিক খেলাগুলো আজও সেই ঐতিহ্যই বাঁচিয়ে রেখেছে।
১৯৮৯ সালের জুলাই। আলাস্কার এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে ইনুপিয়াক সম্প্রদায়ের ক্রীড়াবিদ নিকোল জনসন মনে মনে শুধু একটাই দৃশ্য কল্পনা করেছিলেন—এক লাফে উঠে দুই পা দিয়ে ঝুলন্ত বলটিতে আঘাত করছেন তিনি।
সিলের চামড়া দিয়ে তৈরি সেই বলে স্পর্শ করতেই গর্জে ওঠে দর্শকাসন। ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতায় বল স্পর্শ করে নারীদের বিভাগে বিশ্বরেকর্ড গড়েন জনসন।
তিন দশকেরও বেশি সময় পরে, ৫৭ বছর বয়সেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। এবার তিনি অংশ নিচ্ছেন ‘ডেনে স্টিক পুল’ প্রতিযোগিতায়, যেখানে দুই প্রতিযোগী তেল মাখানো কাঠির মাঝখান ধরে টানাটানি করেন। লক্ষ্য—প্রতিপক্ষের হাত থেকে কাঠিটি ছিনিয়ে নেওয়া।
ঐতিহ্যের উৎসব
প্রতি বছর আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কসে অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিকস (WEIO)। এ বছরের আসর বসেছে ১৫ থেকে ১৮ জুলাই।
আলাস্কা, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড এবং সাইবেরিয়ার আদিবাসী ক্রীড়াবিদেরা এখানে শতাব্দীপ্রাচীন নানা খেলায় অংশ নেন। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি চলে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, পোশাক, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
যে খেলার জন্ম সংকেত দেওয়ার জন্য
WEIO-র অন্যতম আকর্ষণ ‘টু-ফুট হাই কিক’।
আজ এটি একটি প্রতিযোগিতা হলেও, একসময় এর ছিল বাস্তব প্রয়োজন। দূরে তিমি শিকারে যাওয়া শিকারিরা গ্রামের মানুষকে সফলতার খবর জানাতে দুই পা তুলে আকাশে লাফিয়ে সংকেত দিতেন। সেই ঐতিহ্যই আজ রূপ নিয়েছে খেলায়।
জনসন এখনও এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বর্তমানে WEIO-র পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং প্রধান বিচারকদের একজন।
তাঁর কথায়,
“যতদিন পারব, এই খেলাগুলো খেলব। প্রয়োজন হলে ওয়াকার বা হুইলচেয়ার নিয়েও মাঠে আসব। খেলতে না পারলেও নতুনদের উৎসাহ দেব, শেখাব।”
বেঁচে থাকার লড়াই থেকেই জন্ম
আলাস্কার আদিবাসী খেলাগুলোর জন্ম হয়েছিল শত শত বছর আগে।
বরফে ঢাকা টুন্ড্রা অঞ্চলে টিকে থাকতে যে শক্তি, ভারসাম্য, সহনশীলতা ও দ্রুততা দরকার ছিল, সেগুলো অনুশীলনের জন্যই তৈরি হয় এসব খেলা।
আজ আর শিকার বা মাছ ধরার জন্য সেই দক্ষতার প্রয়োজন না থাকলেও, খেলাগুলো আদিবাসী সংস্কৃতি ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য হতে হয় এবং ন্যূনতম বয়স হতে হয় ১২ বছর। অনেকেই সত্তর পেরিয়েও অংশ নেন। তাঁদের কাছে পদকের চেয়ে বড় পুরস্কার হলো সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখা।
গত বছর WEIO দেখতে প্রায় তিন হাজার দর্শক টিকিট কেটেছিলেন।
এক সময় নিষিদ্ধ ছিল এই খেলাই
এই ঐতিহ্য সবসময় এতটা নিরাপদ ছিল না।
১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কা অধিগ্রহণের পর আদিবাসীদের জোর করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নীতি চালু হয়।
১৮৮৪ সালের অর্গানিক অ্যাক্ট-এর পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মিশনারি বোর্ডিং স্কুল। হাজার হাজার শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। মাতৃভাষায় কথা বললে শাস্তি দেওয়া হতো। নিষিদ্ধ করা হয় ঐতিহ্যবাহী শিকার, মাছ ধরা এবং তার সঙ্গে যুক্ত খেলাধুলাও।
ট্লিংগিট নৃতত্ত্ববিদ ও সিলাস্কা হেরিটেজ ইনস্টিটিউট-এর সভাপতি রোসিটা ওরল বলেন,
“এই খেলাগুলো ছিল শিকার ও মাছ ধরার প্রশিক্ষণ। শিকার বন্ধ করতে চাইলে সেই প্রশিক্ষণও বন্ধ করে দিতে হতো।”
রোসিটা নিজেও মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়েছিলেন। বছরের পর বছর সেখানে নির্যাতনের শিকার হন।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন,
“আমাদের ভাষা, অনুষ্ঠান আর খেলাধুলা—সবই গোপনে করতে হতো। আশপাশে শ্বেতাঙ্গ কাউকে দেখলেই আমরা থেমে যেতাম।”
পুনর্জাগরণের সূচনা
১৯৬০-এর দশকে আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের জেরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
১৯৬১ সালে প্রথমবার আয়োজন করা হয় WEIO, যাতে নতুন প্রজন্মের কাছে এই খেলাগুলো পৌঁছে দেওয়া যায়।
এরপর ১৯৭১ সালের আলাস্কা নেটিভ ক্লেমস সেটেলমেন্ট অ্যাক্ট আদিবাসীদের প্রায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ একর জমির মালিকানা দেয়। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতাও বাড়তে থাকে। সেই সময় থেকেই আদিবাসী ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ আরও গতি পায়।
নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন দায়িত্ব
আজ পরিবার, স্কুল এবং কমিউনিটি সেন্টারে শিশু-কিশোরদের নিয়মিত শেখানো হয় এই খেলাগুলো।
ইউপিক সম্প্রদায়ের অ্যাম্বার ভাস্কা মাত্র দশ বছর বয়সে স্কুলে প্রথম এসব খেলার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে অংশ নেন নেটিভ ইয়ুথ অলিম্পিকস-এ।
তিনি বলেন,
“নিজের ভাষা পুরোপুরি শিখিনি, সেলাইও খুব একটা পারি না। কিন্তু এই খেলাগুলো শিখেছি। এভাবেই আমি আমার সংস্কৃতিকে উদ্যাপন করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।”
এবারের WEIO-তে তিনি ‘নিল জাম্প’-সহ একাধিক ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন। এই খেলার উৎপত্তি হয়েছিল বরফ ভেঙে পড়লে দ্রুত উঠে দাঁড়ানোর দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে।
‘এটাও সত্যিকারের খেলা’
ট্লিংগিট, ইউপিক এবং ডেগ হিট’আন আথাবাস্কান বংশোদ্ভূত কাইল ওরল ২০১১ সাল থেকে WEIO-তে প্রতিযোগিতা করছেন। এখন তিনি তরুণদের প্রশিক্ষণও দেন।
কৈশোরে একবার আলাস্কা নেটিভ হেরিটেজ সেন্টারে প্রদর্শনীর সময় তিনি এক শিক্ষককে বলতে শুনেছিলেন—
“এগুলো আসল খেলা নয়।”
সেই মন্তব্যই তাঁর জীবন বদলে দেয়।
কাইল বলেন,
“সেদিনই ঠিক করেছিলাম, সবাইকে প্রমাণ করব—আমিও একজন সত্যিকারের ক্রীড়াবিদ, আর এটাও সত্যিকারের খেলা।”
আজ তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে আর্কটিক খেলার প্রদর্শনী করেন। মেক্সিকো ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়কেও এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেছেন।
অলিম্পিকে পৌঁছনোর স্বপ্ন
এখন কাইল ওরলের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে প্রদর্শনী ইভেন্ট হিসেবে আর্কটিক খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা।
তাঁর বিশ্বাস, এতে শুধু একটি খেলার পরিচয়ই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাতের মুখে থাকা আর্কটিক অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংগ্রাম ও সংস্কৃতিও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
তাঁর কথায়,
“আমি চাই না আমাদের সংস্কৃতি শুধু জাদুঘরের নিদর্শন হয়ে থাকুক। এটি একটি জীবন্ত সংস্কৃতি, যা সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। আমাদের ভাষা, খেলাধুলা ও ঐতিহ্য মানবসভ্যতার বৈচিত্র্যের অংশ। তাই বিশ্বমঞ্চেও এর যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।”