হাইলাইটস:

  • নবম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা চালু নিয়ে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের।
  • বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন বলেন, বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় নতুন ভাষার চাপ অযৌক্তিক।
  • আদালতের মত, তৃতীয় ভাষা শেখাতে হলে তা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই শুরু করা উচিত।
  • তামিলনাড়ুর দুই-ভাষা নীতি ও জওহর নবোদয় বিদ্যালয় নিয়ে মামলার শুনানিতে উঠে আসে এই মন্তব্য।
  • সম্প্রতি সিবিএসই নবম শ্রেণির বর্তমান ব্যাচকে এককালীন ছাড় দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: নবম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন্দ্র ও সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-কে কার্যত সতর্ক করল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার আদালত স্পষ্ট জানায়, দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু হওয়ার ঠিক আগে শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন একটি ভাষার বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যদি তৃতীয় ভাষা শেখানোই উদ্দেশ্য হয়, তবে তা অনেক আগে, অন্তত ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই শুরু করা উচিত।

বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন এই মন্তব্য করেন তামিলনাড়ু সরকারের একটি আবেদনের শুনানিতে। মামলাটি মূলত ২০১৭ সালের মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি রায়কে ঘিরে। সেই রায়ে তামিলনাড়ু সরকারকে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় জওহর নবোদয় বিদ্যালয় (জেএনভি) স্থাপনে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তামিলনাড়ু দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে।

রাজ্যের যুক্তি, জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে তিন-ভাষা সূত্র অনুসরণ করা হয়, যা তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দুই-ভাষা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বাধীনতার পর থেকেই তামিলনাড়ু মূলত তামিল ও ইংরেজিকে শিক্ষার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং হিন্দি বা অন্য কোনও তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতা করে আসছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আদালতে ভাষানীতি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন বিচারপতি নাগরত্ন মন্তব্য করেন, নবম শ্রেণিতে হঠাৎ একটি নতুন ভাষা বাধ্যতামূলক করা শিক্ষার্থীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে। তাঁর বক্তব্য, নবম ও দশম শ্রেণি বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই পর্যায়ে নতুন ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা শিক্ষার্থীদের মূল বিষয়গুলির পড়াশোনায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিচারপতির মতে, ভাষা শিক্ষা যদি শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়, তাহলে তার ভিত্তি অনেক আগেই গড়ে তোলা উচিত। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে ভাষা শিক্ষা শুরু হলে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না এবং তারা স্বাভাবিকভাবেই ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারবে।

আদালতের এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই সিবিএসই নিজেদের সিদ্ধান্তে আংশিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। নতুন শিক্ষানীতির আলোকে নবম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর দেশজুড়ে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে, শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে বহু শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়বে।

এই আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সিবিএসই চলতি শিক্ষাবর্ষের নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এককালীন ছাড় ঘোষণা করে। জানানো হয়, বর্তমান ব্যাচের শিক্ষার্থীদের দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা পরীক্ষা দিতে হবে না। তবে ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা খোলা রাখা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিল। যদিও আদালত এখনও এ বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি, তবু বিচারপতির মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বয়স ও শিক্ষার স্তরকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেই আদালত।

অন্যদিকে, তামিলনাড়ু সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, রাজ্যের ভাষানীতি জনগণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মতে, জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের মাধ্যমে কার্যত তিন-ভাষা নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রাজ্যের নীতির পরিপন্থী। কেন্দ্র অবশ্য বরাবরই বলেছে, জওহর নবোদয় বিদ্যালয়গুলি গ্রামীণ এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের আবাসিক শিক্ষা নিশ্চিত করে এবং ভাষানীতির উদ্দেশ্য জাতীয় সংহতি ও বহুভাষিক দক্ষতা গড়ে তোলা।

এই মামলার চূড়ান্ত রায় এখনও হয়নি। তবে বৃহস্পতিবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট যে বার্তা দিল, তা ভবিষ্যতে সিবিএসই এবং কেন্দ্রের ভাষানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষানীতির অধীনে ভাষা শিক্ষার কাঠামো নির্ধারণে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়ানোর প্রশ্নটি এখন বিচারব্যবস্থার নজরেও যে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেল।