হাইলাইটস:
- প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবছিল মোসাদ—দাবি নিউ ইয়র্ক টাইমস ও হারেৎজ-এর।
- ২০২২ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে গোপন যোগাযোগ, এমনকি বুদাপেস্টে মোসাদ প্রধানের বৈঠকেরও দাবি প্রতিবেদনে।
- ইজরায়েলের নিরাপত্তা মহলের ভেতরেই এই পরিকল্পনা নিয়ে ছিল তীব্র মতবিরোধ।
ইরানের সবচেয়ে কট্টর ইজরায়েল-বিরোধী নেতাদের একজন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি হলোকস্টকে ‘মিথ’ বলে দাবি করেছিলেন, এমনকি ইজরায়েলের অস্তিত্ব মুছে ফেলার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। অথচ সেই ব্যক্তিকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ—এমনই বিস্ফোরক দাবি করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ইজরায়েলের হারেৎজ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকেই আহমাদিনেজাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করে মোসাদ। বিষয়টিকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল যে সংস্থার প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ব্যক্তিগতভাবে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। হারেৎজ-এর দাবি, গাজায় যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নির্ধারিত নিরাপত্তা বৈঠকেও অনুপস্থিত ছিলেন বার্নিয়া, কারণ তিনি এই গোপন মিশনে ব্যস্ত ছিলেন।
বলা হচ্ছে, একটি জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে বুদাপেস্টে গিয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ। সেই সফরেই তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে মোসাদ। পরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-কে জানানো হয় যে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। গুয়াতেমালা সফরের পর সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফরের যাতায়াত ও আবাসনের কিছু খরচও নাকি বহন করেছিল মোসাদ। হাঙ্গেরিতে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন সংস্থার কর্মকর্তারা। সে সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভিক্টর অরবান, যিনি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প—উভয়েরই ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
এই দাবিগুলি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন সাম্প্রতিক মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার পর ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর চারজন মোসাদ এজেন্ট আহমাদিনেজাদকে তাঁর বাড়ি থেকে সরিয়ে তেহরানের একটি নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব হিসেবে সুরক্ষিত রাখা।
তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পুরো অভিযানের বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত হয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে যান আহমাদিনেজাদ। এরপর থেকেই তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আহমাদিনেজাদ ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে আরও আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে নেন। তাঁর আমলেই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। হলোকস্টের সত্যতা নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি, যার জেরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
তবে ২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ধীরে ধীরে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে চাইলেও গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করে। এরপর থেকেই তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন আসে বলে দাবি প্রতিবেদনের।
তিনি ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইংরেজিতেই বক্তৃতা দেন। নিজের চেহারাতেও আনেন পরিবর্তন—দাড়ি ছাঁটেন, পরিচিত সাদা জ্যাকেটের বদলে নতুন পোশাকে দেখা যায় তাঁকে। এমনকি বোটক্স চিকিৎসাও করিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের নেতৃত্ব দেওয়া আহমাদিনেজাদ পরবর্তীকালে সেই দমননীতিরই সমালোচনা করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি দেশের জন্য লাভের চেয়ে বোঝা হয়ে উঠছে বলেও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বলে হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মোসাদের এই গোপন পরিকল্পনার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন পুস ইন বুটস’। তবে ইজরায়েলের নিরাপত্তা মহলের সবাই এতে একমত ছিলেন না। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তজাচি হানেগবি একে ‘উন্মাদ কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেন। সেনাপ্রধান এয়াল জামিরও অভিযানের তিন দিন আগে পরিকল্পনা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে বলেন বলেই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই পুরো কাহিনির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা। তাঁর মতে, যদি মোসাদ সত্যিই আহমাদিনেজাদকে এত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, তাহলে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে চলে যেতে দেওয়া হলো কেন? তাঁর ধারণা, এই ধরনের তথ্য ফাঁসের উদ্দেশ্য ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরে নতুন করে অবিশ্বাস ও বিভাজন তৈরি করাও হতে পারে।