হাইলাইটস:

  • ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান যদি তাঁকে হত্যা করে, তাহলে আমেরিকার সেনাবাহিনীকে ইরানে ব্যাপক হামলার নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন।
  • তবে মার্কিন আইনে এমন নির্দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
  • ট্রাম্প নিহত হলে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
  • হামলা হবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভ্যান্সকেই।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে মৃত্যুর পর কার্যকর হবে এমন ‘ডেড ম্যানস সুইচ’ ধরনের সামরিক নির্দেশের আইনি ভিত্তি নেই।

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান যদি তাঁকে হত্যা করে, তাহলে দেশটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন সামরিক হামলা চালানোর নির্দেশ তিনি আগেই দিয়ে রেখেছেন— এমন বিস্ফোরক দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি যতই ‘স্থায়ী নির্দেশ’-এর কথা বলুন না কেন, মার্কিন সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সেই নির্দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। ট্রাম্পের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসা নতুন প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে হামলা হবে কি না।

সম্প্রতি ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি তাঁর বিরুদ্ধে সফল হত্যাচেষ্টা চালায়, তাহলে আমেরিকার বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দিয়ে এমন পাল্টা আঘাত হানা হবে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তাঁর ভাষায়, প্রয়োজনে “হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত” রয়েছে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানকে কঠোর বার্তা দিতে চেয়েছেন।

কিন্তু এখানেই রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সেই ক্ষমতা ব্যক্তিনির্ভর; প্রেসিডেন্টের মৃত্যু বা অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষমতা তাঁর উত্তরসূরির হাতে চলে যায়। ফলে ট্রাম্প আগে থেকে কোনও নির্দেশ দিয়ে রাখলেও, সেটি বাধ্যতামূলক নয়। নতুন প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই নির্দেশ মানতে পারেন, পরিবর্তন করতে পারেন, এমনকি সম্পূর্ণ বাতিলও করতে পারেন।

অর্থাৎ, যদি ট্রাম্প নিহত হন, তাহলে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকবে তাঁর হাতে। ট্রাম্পের আগের নির্দেশ কেবল একটি রাজনৈতিক বা কৌশলগত নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়।

মার্কিন সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় কোনও ‘ডেড ম্যানস সুইচ’ নেই। অর্থাৎ কোনও প্রেসিডেন্ট মারা গেলে তাঁর আগে থেকে দেওয়া সামরিক নির্দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে— এমন ব্যবস্থা মার্কিন আইনে নেই। কারণ পারমাণবিক বা বৃহৎ সামরিক হামলার মতো সিদ্ধান্তের জন্য ক্ষমতায় থাকা বৈধ প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। ইরানের পক্ষ থেকে বহুবার ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের দাবি। বিশেষ করে ২০২০ সালে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর থেকেই ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধের হুমকি অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা এবং পারস্পরিক হামলার আবহে ট্রাম্পের এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা মূলত প্রতিরোধমূলক বার্তা। এর উদ্দেশ্য ইরানকে বোঝানো যে, তাঁকে হত্যা করলেও আমেরিকার প্রতিক্রিয়া থেমে থাকবে না। তবে বাস্তবে সেই প্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ভর করবে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, প্রতিরক্ষা দফতর এবং সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়নের ওপর।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আইনি বাস্তবতা ভিন্ন। মার্কিন ব্যবস্থায় কোনও প্রেসিডেন্ট ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারেন না। ফলে ট্রাম্পের ‘স্থায়ী নির্দেশ’ কার্যকর হবে কি না, তার একমাত্র নির্ধারক হবেন তাঁর উত্তরসূরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যক্তি হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। যদি কখনও এমন চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে তিনিই আমেরিকার সর্বাধিনায়ক হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন— ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হবে, নাকি অন্য কোনও পথ বেছে নেওয়া হবে।