হাইলাইটস:
- আর্কটিক মহাসাগরের দীর্ঘ শীতকালীন পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে ৫০০ দিনের নজিরবিহীন বৈজ্ঞানিক অভিযান।
- বরফে আটকে থেকেই গবেষণা করবে ভাসমান গবেষণাগার ‘তারা পোলার স্টেশন’।
- জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক প্রাণবৈচিত্র্য ও সমুদ্রের গতিবিদ্যা নিয়ে হবে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ।
- আর্কটিক দ্রুত উষ্ণ হওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তথ্য সংরক্ষণই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
- গবেষণার ফল বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বাংলাস্ফিয়ার: পৃথিবীর এমন একটি সমুদ্র, যা বছরের বড় অংশটাই বরফের নিচে অদৃশ্য হয়ে থাকে—সেই মধ্য আর্কটিক মহাসাগর সম্পর্কে এখনও বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের পরিধি আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত। বছরের ছয় থেকে আট মাস এই অঞ্চল প্রায় ছয় ফুট পুরু বরফে ঢাকা থাকে। তীব্র শুষ্কতা, হঠাৎ তৈরি হওয়া বিধ্বংসী ঝড় এবং মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যাওয়া তাপমাত্রা গবেষণাকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।
এই অজানা জগতের রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যেই ১৯ জুলাই যাত্রা শুরু করছে ‘তারা পোলার স্টেশন’, এক অভিনব ভাসমান গবেষণাগার। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি এই বিশেষ নকশার জাহাজটি বরফের মধ্যে আটকে গিয়ে প্রায় ৫০০ দিন ভেসে থাকবে। এই সময়ে এক ডজন বিজ্ঞানী ধারাবাহিকভাবে আর্কটিকের জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, সমুদ্রের প্রবাহ এবং পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করবেন। মাঝপথে দু’বার কর্মীদল বদল হলেও গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
এই অভিযানের অন্যতম প্রধান মুখ ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী রোম্যাঁ ত্রুবলে। তাঁর মতে, আর্কটিক এমন দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে, এই পরিবর্তনের পূর্ণ চিত্র নথিবদ্ধ করা এখন সময়ের বিরুদ্ধে এক দৌড়। উপগ্রহচিত্র বা শুধু গ্রীষ্মকালের সমীক্ষা দিয়ে এই কাজ সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় বরফের মধ্যে অবস্থান করেই প্রকৃত পরিবর্তন বোঝা যাবে।
ত্রুবলে একই সঙ্গে তারা ওশান ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক। তাঁর পরিকল্পনাতেই তৈরি হয়েছে এই অভিনব গবেষণা কেন্দ্র, যার মাঝখানে রয়েছে একটি বিশেষ জলকূপ। সেখান থেকে সরাসরি সমুদ্রের জল, অণুজীব, প্ল্যাঙ্কটন এবং অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করা যাবে।
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ এক দশক লেগেছে। সরকারি অনুদান, কর্পোরেট অংশীদারিত্ব এবং বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ পাউন্ড সংগ্রহের পর নির্মাণ শুরু হয় ২০২৩ সালে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডির একটি জাহাজ নির্মাণ সংস্থা বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে এই গবেষণাগার তৈরি করে। অ্যালুমিনিয়াম হালকা ও মরিচা-প্রতিরোধী হলেও তা দিয়ে এমন জটিল কাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন।
চারতলা এই ভাসমান গবেষণাগারে রয়েছে শয়নকক্ষ, গবেষণাগার, কার্যালয়, এমনকি দীর্ঘ শীতের মানসিক চাপ সামলাতে একটি স্নানাগারও। ডিম্বাকৃতি কাঠামোর কারণে বরফ জমে গেলেও জাহাজের ক্ষতি হবে না; বরং বরফের সঙ্গে ভেসে যাবে সমুদ্রস্রোতের টানে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৪৬ সালের মধ্যে অন্তত দশটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে এই গবেষণাগার ব্যবহার করা হবে।
ত্রুবলের নিজের জীবনও যেন এক অভিযাত্রার গল্প। একসময় তিনি নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের স্বপ্নে প্রতিযোগিতামূলক নৌযানে অংশ নিয়েছেন, সাইবেরিয়ার চিরতুষারে ম্যামথের জীবাশ্ম খুঁজেছেন এবং একাধিক মেরু অভিযানে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর লক্ষ্য বদলেছে। এখন তাঁর প্রশ্ন আর “নতুন কী আছে?” নয়; বরং “এই পৃথিবীকে কীভাবে রক্ষা করা যায়?”
তাঁর মতে, পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধুই সংকটের গল্প হিসেবে দেখলে হবে না। বিজ্ঞান, পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষাকে মানুষের কাছে অনুপ্রেরণাদায়ক এবং সম্ভাবনাময় করে তুলতে হবে। এমনকি এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও জড়িয়ে থাকতে পারে।
তবে তিনি আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও লুকিয়ে রাখেন না। জীববিজ্ঞানী হিসেবে তিনি জানেন, পরিবেশের মাত্র এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি জীবজগতের ওপর কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর ভাষায়, “আমার দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি আর কী করতে পারি?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জন্ম নিয়েছে তারা পোলার স্টেশন।
তবে এই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন দিক প্রকৃতি নয়, মানুষ। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় মেরু অভিযাত্রীদের মধ্যে মানসিক ভাঙন, সন্দেহপ্রবণতা, এমনকি সহিংসতার ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। তাই ত্রুবলের মতে, এমন অভিযানে ব্যক্তিগত নেতৃত্বের চেয়ে দলগত চেতনা এবং অভিন্ন লক্ষ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু আর্কটিকেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে আর্কটিক পৃথিবীর গড়ের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এখানকার তথ্য ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণাগারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে, যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক আবহাওয়া, ঝড়ের প্রকৃতি এবং মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যায়।
এছাড়া আর্কটিকে এমন বহু অণুজীব, জিন ও প্রোটিন রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। অতীতে এখানকার মাছ থেকেই অ্যান্টিফ্রিজ প্রোটিনের সন্ধান মিলেছিল, যা বর্তমানে অঙ্গ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি আবার অ্যান্টার্কটিকার সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার সন্ধানও পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
কিন্তু একই সঙ্গে আর্কটিকের বরফ গলতে থাকায় নতুন সমুদ্রপথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে বাণিজ্যিক মাছ ধরা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং সমুদ্রতলের খনিজ আহরণের আগ্রহও বাড়ছে। যদিও ২০৩৭ সাল পর্যন্ত মধ্য আর্কটিকে এ ধরনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ, তবু ভবিষ্যতের চাপ স্পষ্ট।
ত্রুবলের বিশ্বাস, মানবজাতির এই যৌথ প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হলে এখনই আর্কটিককে বুঝতে হবে। তাঁর কথায়, “এই অঞ্চলের জীবন ও প্রকৃতি হয়তো দ্রুত বদলে যাবে। তাই যতটা সম্ভব নথিবদ্ধ করা, জানা এবং শেখাই আমাদের মিশন।”