হাইলাইটস:

  • ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে।
  • দলীয় প্রতীক, মঞ্চ নির্মাণ, পোস্টার, ব্যানার এবং কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ।
  • বিভিন্ন জেলায় পৃথক গোষ্ঠীর শক্তি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে উত্তেজনা।
  • বিরোধীদের দাবি, সংগঠনের ভিতরে নেতৃত্বের লড়াই ক্রমশ প্রকাশ্যে চলে আসছে।
  • রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনের নেতৃত্বের প্রশ্নে এই সংঘাত আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে ২১ জুলাই শুধু একটি বার্ষিক কর্মসূচি নয়, এটি দলের রাজনৈতিক পরিচয়, আবেগ এবং শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। প্রতি বছর এই দিনকে ঘিরে লক্ষ লক্ষ কর্মী-সমর্থকের সমাবেশ হয় কলকাতায়। সেই কারণেই শহিদ দিবসের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা সংগঠন নড়েচড়ে বসে। কিন্তু এবার সেই প্রস্তুতির আবহেই সামনে চলে এসেছে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। প্রতীক ব্যবহার থেকে শুরু করে মঞ্চ নির্মাণ, ব্যানার, পোস্টার, শোভাযাত্রার রুট কিংবা কে কোথায় থাকবেন— প্রায় প্রতিটি বিষয় নিয়েই একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে।

দলের একাংশের অভিযোগ, শহিদ দিবসকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কে বেশি সংখ্যক কর্মী আনতে পারবেন, কার ছবি বড় হবে, কার নেতৃত্বে মিছিল বেরোবে এবং কোন নেতা মূল মঞ্চের কাছাকাছি থাকবেন— এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় একই দলের দুই গোষ্ঠী আলাদা প্রস্তুতি সভা করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংঘাত শুধুমাত্র সাংগঠনিক নয়, এর পিছনে রয়েছে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের সমীকরণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। জেলা, ব্লক এবং পুরসভা স্তরে অনেক নেতা নিজেদের স্বতন্ত্র প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছেন। শহিদ দিবসের মতো বড় কর্মসূচি সেই প্রভাব প্রদর্শনের অন্যতম সুযোগ হয়ে ওঠে। ফলে একই দলের মধ্যেই শুরু হয় প্রতিযোগিতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহিদ দিবসের মঞ্চে কারা দৃশ্যমান থাকবেন, কারা মুখ্যমন্ত্রীর কাছাকাছি জায়গা পাবেন, কার বক্তব্য কতটা গুরুত্ব পাবে— এসবই রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তাই প্রস্তুতি পর্ব থেকেই নানা স্তরে সূক্ষ্ম লড়াই শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা প্রকাশ্য বিবাদেও পরিণত হচ্ছে।

দলীয় সূত্রের দাবি, একাধিক জেলায় পোস্টার ও ব্যানার নিয়ে বিবাদ হয়েছে। কোথাও কোনও নেতার ছবি বাদ পড়েছে, কোথাও আবার অন্য গোষ্ঠীর পোস্টার খুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিছু এলাকায় দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অধিকার নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কর্মীদের মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে রাজ্য নেতৃত্বের উদ্বেগও বেড়েছে। কারণ ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ ঐতিহ্যগতভাবে দলীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার মঞ্চ। সেই অনুষ্ঠানের আগেই যদি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে, তাহলে বিরোধীদের হাতে রাজনৈতিক অস্ত্র তুলে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বকে সংযত থাকার এবং প্রকাশ্যে কোনও বিবাদে না জড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

বিরোধী শিবির অবশ্য এই ঘটনাকে তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতার লক্ষণ বলেই ব্যাখ্যা করছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে আদর্শের জায়গা দখল করেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি। ফলে কর্মসূচির চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলছে, এত বড় সংগঠনে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা দলের সামগ্রিক কর্মসূচিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই কিছু না কিছু প্রতিযোগিতা দেখা যায়। তবে এবারের পরিস্থিতির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংগঠনকে নতুন করে শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে তৃণমূল। সেই প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যত বেশি প্রকাশ্যে আসবে, ততই সংগঠনের বার্তা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তাঁদের মতে, দলীয় প্রতীক বা মঞ্চের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসলে ক্ষমতার প্রতীকী প্রকাশ। যে গোষ্ঠী এই প্রস্তুতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতের সাংগঠনিক সমীকরণেও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পাবে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে ছোট বলে মনে হলেও এই ধরনের সংঘাতের রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

এখন নজর ২১ জুলাইয়ের মূল সমাবেশের দিকে। শেষ পর্যন্ত দলীয় নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে সব গোষ্ঠীকে এক ছাতার নীচে আনতে পারে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ শহিদ দিবস তৃণমূলের কাছে শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের দিশা দেখানোরও মঞ্চ। সেই মঞ্চে বিভক্তির ছবি নয়, ঐক্যের বার্তা তুলে ধরাই দলের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।