হাইলাইটস:

  • বারুইপুরে নিখোঁজ নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর বিস্ফোরক পরিস্থিতি।
  • পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে; তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
  • সন্দেহভাজন বলে গণপিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু।
  • বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, রাস্তা ও রেল অবরোধ।
  • তিনটি পৃথক মামলার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন।

বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রবিবার ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ থাকা ওই নাবালিকার দেহ রবিবার সকালে একটি পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়ার পর এলাকাজুড়ে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। পরিবারের অভিযোগ, নাবালিকাকে অপহরণ করে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত ও ফরেন্সিক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, শনিবার বিকেলে বাড়ির কাছের একটি দোকানে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়েছিল নাবালিকা। দীর্ঘ সময় বাড়ি না ফেরায় আত্মীয়-প্রতিবেশীরা রাতভর খোঁজাখুঁজি চালান। পরে রবিবার সকালে বাড়ির অদূরে একটি পুকুর থেকে তার দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা এলাকায় শোক ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়েন।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, নিখোঁজ হওয়ার আগে এক ব্যক্তির সঙ্গে নাবালিকাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল। সেই সূত্র ধরে একজনকে আটক করে পরে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্টের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে মামলায় আরও ধারা যোগ করা হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত বলে সন্দেহভাজন এক যুবককে ধরে ফেলে। অভিযোগ, তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই গণপিটুনির ঘটনাটিও পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনও অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করা যায় না এবং এই ঘটনায় জড়িতদেরও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা কুলপি রোড অবরোধ করেন। সূর্যপুর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেললাইন অবরোধ হওয়ায় শিয়ালদহ–নামখানা শাখায় ট্রেন চলাচল কয়েক ঘণ্টা ব্যাহত হয়। বহু যাত্রী দুর্ভোগের মুখে পড়েন। যানজটের জেরে বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবনও কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়।

উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং ইট-পাটকেল ছোড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়। পরে অতিরিক্ত বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় কড়া পুলিশি নজরদারি রয়েছে এবং যাতে নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে জেলা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে। এই দল নাবালিকার মৃত্যুর মামলা, গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু এবং পুলিশের উপর হামলার ঘটনাসহ তিনটি পৃথক মামলার তদন্ত করবে। তদন্তের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ডিজিটাল তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, তদন্তে কোনও রকম গাফিলতি হবে না। বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোবে। অপরাধে যাঁরা জড়িত, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গণপিটুনিতে জড়িতদেরও শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলছে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে তদন্ত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে হবে এবং কোনও প্রভাব খাটতে দেওয়া হবে না।

বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও শিশু-নিরাপত্তা, নারী নির্যাতন রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, অপরাধের প্রতিবাদ যতই প্রবল হোক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আরও একটি প্রাণহানির কারণ হতে পারে। ফলে একদিকে নাবালিকার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, অন্যদিকে গণপিটুনির ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত—দুটিই এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন গোটা রাজ্যের নজর বারুইপুরের তদন্তের দিকে। ময়নাতদন্ত, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তের ভিত্তিতে এই ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রশাসনের কাছ থেকে দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।