Home খবর রাশিয়ার ভয়ে গটল্যান্ডে যুদ্ধের প্রস্তুতি

রাশিয়ার ভয়ে গটল্যান্ডে যুদ্ধের প্রস্তুতি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
102 views 3 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কায় গটল্যান্ডকে সামরিক দুর্গে পরিণত করছে সুইডেন।
  • বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে যোগ দিচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা; পুনর্গঠিত হয়েছে সেনা ঘাঁটি।
  • ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর দ্বীপে নিয়মিত যৌথ মহড়া চলছে।
  • শুধু সেনাবাহিনী নয়, খাদ্য, জল, বিদ্যুৎ ও জরুরি পরিষেবায় স্বনির্ভর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাসিন্দারাও।
  • সুইডেনের মতে, গটল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ মানেই বাল্টিক সাগরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ।

চার মাস আগেও ১৯ বছরের এলা আদমান ছিলেন একেবারে সাধারণ স্কুলছাত্রী। জীবনে কখনও অস্ত্র হাতে তোলেননি। এখন তিনি সুইডেনের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার সদস্য। বাল্টিক সাগরের গটল্যান্ড দ্বীপে কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, হাতে অত্যাধুনিক রাইফেল। আর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানী স্টকহোমে রাজপরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্বে তাঁর প্রথম সরকারি মোতায়েন।

শুরুর দিকে টানা ১৫ মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টার অনুশীলন এবং কঠোর শৃঙ্খলা তাঁর কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এখন অবশ্য এলা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের সক্ষমতা চিনতে এবং দলগতভাবে লড়াই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

এলার মতো শত শত তরুণ-তরুণীকে এখন পাঠানো হচ্ছে গটল্যান্ডে। একসময়ের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে সুইডেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে।

শীতল যুদ্ধের সময় গটল্যান্ডে চারটি সেনা রেজিমেন্ট ছিল, যেখানে পূর্ণ সমাবেশে প্রায় ২৫ হাজার সেনা মোতায়েন করা যেত। কিন্তু ২০০৫ সালে শেষ রেজিমেন্টও বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি বদলায় রাশিয়ার বাড়তে থাকা সামরিক তৎপরতার পর। ২০১৮ সালে আবার সেনা ঘাঁটি পুনর্গঠন শুরু হয়, আর ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে।

গটল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বই এই তৎপরতার মূল কারণ। রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ থেকে মাত্র ২৭৫ কিলোমিটার দূরে এবং সুইডেনের মূল ভূখণ্ড থেকে ৮৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপ। সুইডিশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গটল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, কার্যত বাল্টিক সাগরের আকাশ ও সমুদ্রপথের উপর তারই প্রভাব থাকবে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সেনা ও রসদ পরিবহণের পথও অনেকটাই তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

গটল্যান্ডে সুইডিশ সেনাবাহিনীর প্রধান কর্নেল আন্দ্রেয়াস গুস্তাফসনের কথায়, “যে গটল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বাল্টিক সাগরও নিয়ন্ত্রণ করবে। তাই এই দ্বীপের নিরাপত্তা শুধু সুইডেনের নয়, পুরো ন্যাটোর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।”

ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর গটল্যান্ড এখন নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার কেন্দ্র। একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে প্রতিরক্ষা ব্যয়। ২০২৬ সালে জিডিপির ২.৮ শতাংশ এবং ২০২৮ সাল থেকে ৩.১ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে সুইডেন। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে।

তবে এই পুনরায় অস্ত্রসজ্জার পথে বাধাও কম নয়। ন্যাটোর অধিকাংশ দেশ একসঙ্গে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনতে নামায় কামানসহ ভারী অস্ত্রের সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে বাহিনীর সম্প্রসারণের গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে।

সুইডিশ সেনাবাহিনীর মূল্যায়ন, এই মুহূর্তে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হামলার সম্ভাবনা সীমিত। তবে গুপ্তচরবৃত্তি, অন্তর্ঘাত ও নাশকতার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেনে যুদ্ধ থেমে গেলে রাশিয়া দ্রুত বাল্টিক অঞ্চলে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে।

সেই কারণেই গটল্যান্ডের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় আকারে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার বদলে দ্বীপেই থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। পূর্ণ সমাবেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার সেনা দ্বীপ রক্ষায় প্রস্তুত থাকবে।

সমান গুরুত্ব পাচ্ছে নাগরিক প্রতিরক্ষাও। চিকিৎসক ইভা রিনব্লাড নিজের এলাকায় জরুরি প্রস্তুতি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। প্রতিবেশীদের নিয়ে পানীয় জল, খাদ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে আশ্রয়, রান্না, মোবাইল চার্জ এবং তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি নিরাপত্তা কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

নিজের বাড়িতেই তিনি খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ফল-সবজির বাগান, হাঁস-মুরগি, সৌরবিদ্যুৎ এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, যুদ্ধ শুরু হলেও সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যতটা সম্ভব সচল রাখতে হবে।

এ বছর গটল্যান্ডে কয়েকশো বাসিন্দাকে নিয়ে পরীক্ষামূলক জরুরি স্থানান্তর মহড়াও অনুষ্ঠিত হবে।

সুইডেনের নাগরিক প্রতিরক্ষা ও স্থিতিস্থাপকতা সংস্থার মহাপরিচালক মিকায়েল ফ্রিসেলের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে শুধু শক্তিশালী সেনাবাহিনী যথেষ্ট নয়; সমান শক্তিশালী নাগরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অপরিহার্য। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে গটল্যান্ড মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যেতে পারে। তাই দ্বীপকে যতটা সম্ভব স্বনির্ভর করে তোলার কাজ চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জরুরি চিকিৎসা, ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার, ব্যাপক হতাহতের মোকাবিলা এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে।

গটল্যান্ডের এই মডেল এখন গোটা সুইডেনের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠছে। ব্রিটেনসহ একাধিক দেশও সুইডেনের নাগরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

যদিও এই সামরিক সম্প্রসারণ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, নতুন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সামরিক উপস্থিতি দ্বীপের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। তবু অধিকাংশেরই মত, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গটল্যান্ডকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পরিণত করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles