হাইলাইটস
- ১৭ জুলাই ভেনিস সফরে আসছেন ইতালিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ও ধনকুবের টিলম্যান ফার্টিটা।
- তাঁর ১১৭ মিটার দীর্ঘ সুপারইয়ট ‘বোর্ডওয়াক’ ভেনিসের ঐতিহাসিক লেগুনে নোঙর করতে পারে বলে আশঙ্কা।
- গত বছর জেফ বেজোসের বিয়ের অনুষ্ঠান যাঁরা বিক্ষোভে ব্যাহত করেছিলেন, তাঁরাই এবার নতুন আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
- ভেনিসবাসীর অভিযোগ, ধনকুবেরদের ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত হচ্ছে শহর।
- ‘ভেনিসকে ব্যবহার করা বন্ধ করুন’—এই স্লোগানে প্রতিবাদ গড়ে তুলছে আন্দোলনকারীরা।
ইতালির ভেনিসে আবারও ধনকুবের-বিরোধী বিক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছে। গত বছর অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে যে প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক শিরোনামে এসেছিল, এবার সেই একই সংগঠনের নিশানায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ও বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী টিলম্যান ফার্টিটা। তাঁর বিলাসবহুল সুপারইয়ট ‘বোর্ডওয়াক’ নিয়ে ভেনিস সফরের পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ১৭ জুলাই ফার্টিটা তাঁর ১১৭ মিটার দীর্ঘ ব্যক্তিগত ইয়ট নিয়ে ভেনিসে পৌঁছবেন। ইতালির উপকূল ঘুরে আমেরিকা-ইতালি সম্পর্কের ২৫০ বছর উদ্যাপনের অংশ হিসেবে তিনি এই সফরের নাম দিয়েছেন ‘কোস্টাল ডিপ্লোম্যাসি ২৫০’। তবে ভেনিসবাসীর একাংশের মতে, কূটনৈতিক সফরের আড়ালে শহরটিকে আবারও ধনকুবেরদের ব্যক্তিগত প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক বৈঠকে প্রায় ৪০ জন আন্দোলনকারী আগামী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে ২৮ বছরের গবেষক ও সমাজকর্মী স্টেলা ফায়ে বলেন, “গত বছর আমরা জেফ বেজোসের বিয়ের অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করেছিলাম। এবার রাষ্ট্রদূতের সফরও শান্তিতে হতে দেব না।” বৈঠকে হাস্যরসের মধ্যেই কেউ কেউ গত বছরের সেই আলোচিত ‘কুমির পরিকল্পনা’ ফিরিয়ে আনার কথাও বলেন। তখন বিক্ষোভকারীরা খালের জলে ফোলানো কুমির ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই চাপেই শেষ মুহূর্তে বেজোসের বিয়ের সংবর্ধনার স্থান বদলাতে হয়েছিল।
ফার্টিটার ইয়টটি প্রায় ৩২ মিটার উঁচু, ছয় তলা বিশিষ্ট। এতে রয়েছে দুটি হেলিপ্যাড, দুটি সুইমিং পুলসহ নানা বিলাসবহুল সুবিধা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইয়টটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি আমেরিকান ডলার। ভেনিস বন্দর কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, এত বড় ইয়ট শহরের কেন্দ্রের খুব কাছেই নোঙর করতে পারে, যা স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় আপত্তির কারণ সময় নির্বাচন। ফার্টিটার সফর পড়ছে রেডেন্তোরে উৎসবের সপ্তাহান্তে। ষোড়শ শতকে প্লেগ মহামারির অবসান স্মরণে প্রতি বছর জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব হয়। অস্থায়ী ভাসমান সেতু দিয়ে হাজার হাজার মানুষ গির্জায় যান এবং রাতে খালপাড়ে ও নৌকায় বসে বর্ণাঢ্য আতশবাজির প্রদর্শনী উপভোগ করেন।
আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, বিশাল ইয়টটি যদি শহরের কেন্দ্রে নোঙর করে, তবে সাধারণ মানুষের দৃশ্যপট আংশিকভাবে ঢেকে যাবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাষ্ট্রদূতের ইয়ট ঘিরেই ব্যস্ত থাকবে, ফলে উৎসব পরিচালনা ও জননিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে। সমাজকর্মী জুলিয়া কাকোপার্দো বলেন, “ভেনিসে বাস করার মতো বাড়ি নেই, স্থায়ী কাজ নেই। অথচ ধনকুবেররা মনে করেন, অর্থ থাকলেই শহরটিকে নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারবেন। এটি অর্থের ঔদ্ধত্যের প্রতীক।”
প্রতিবাদকারীরা তাঁদের আন্দোলনের স্লোগান রেখেছেন “ভেনেজিয়া নন সি ইউএসএ”, যার দ্বৈত অর্থ—“ভেনিসকে ব্যবহার করা বন্ধ করুন” এবং “ভেনিস আমেরিকা নয়”। তাঁদের অভিযোগ, ফার্টিটা শুধু ধনী ব্যবসায়ী নন, তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারেও অর্থসাহায্য করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক পরিচয়ও আন্দোলনের অন্যতম কারণ। এদিকে ফার্টিটার সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মেলোনি নাকি তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এর জবাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি বা ইতালি কখনও কারও কাছে অনুরোধ করি না।” তবে ফার্টিটা ইতালীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই; তাঁদের অবস্থান এখনও একই।
এখন নজর ১৭ জুলাইয়ের দিকে। গত বছর যেমন বেজোসের বিয়ে ঘিরে প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি এবারও ভেনিসের ঐতিহ্য, নাগরিক অধিকার এবং ধনকুবেরদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।