Table of Contents
হাইলাইটস:
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত সমঝোতা নিয়ে ইরানে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত।
- কট্টরপন্থীদের অভিযোগ, চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ বা হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা নেই।
- সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, এই চুক্তি যুদ্ধ বন্ধ করবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নতুন কোনো বাধ্যবাধকতা চাপাবে না।
- হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ইরান ও ওমান ফি আদায় করতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে।
- বিরোধীরা বলছে, যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হরমুজ প্রণালীকে কেন ছেড়ে দেওয়া হবে?
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে ইরানের ভেতরে প্রবল মতভেদ দেখা দিয়েছে। দেশের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ এই সমঝোতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অভিযোগ, আলোচনায় যে খসড়া চুক্তি তৈরি হয়েছে তাতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়নি। এমনকি হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও এতে নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরানের সংসদ সদস্য কামরান গাজানফারি বলেন, “আমরা জিতেছি আর আমেরিকা পিছু হটেছে—এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।” একই সুরে কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘রাজা নিউজ’-এর প্রধান এবং প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি-এর ভগ্নিপতি মেইসাম নিলি এই চুক্তিকে “বিপর্যয়কর আত্মসমর্পণ” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জনগণকে নীরব না থাকার আহ্বান জানান।
সরকারের পাল্টা যুক্তি
কট্টরপন্থীদের এই আক্রমণের মুখে চুক্তির পক্ষে সাফাই দিয়েছেন মেহদি মোহাম্মাদি, যিনি আলোচনাকারী দলের প্রধান মোহাম্মদ-বাগের গালিবাফ-এর উপদেষ্টা।
একটি অডিও বার্তায় তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে শুধু ইরান-আমেরিকা সংঘাতই নয়, লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযানও বন্ধ হবে। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়নি। বরং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা—যেমন ইরানের ভেতরেই তার ঘনত্ব কমিয়ে আনা—এসব বিষয় আগামী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মাদির মতে, চুক্তিতে “ইরানি ব্যবস্থাপনা” কথাটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ইরান ও ওমান ফি আদায় করতে পারবে। এমনকি তিনি দাবি করেন, এর ফলে ইজরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, এই শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়ার জন্য আমেরিকা অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রথমবারের মতো কিছু প্রাথমিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারেও সম্মতি দিয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবস্থান অপরিবর্তিত
মোহাম্মাদির দাবি, চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রসঙ্গে একমাত্র উল্লেখ হলো—ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা কিনবে না। তাঁর কথায়, “এটাই তো আমরা বহু বছর ধরে বলে আসছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই সমঝোতা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও ভালো। কারণ তখন ইরানকে নিজের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশায়। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
তাঁর ভাষায়, “এবার আমরা পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে বসে থাকব না যে তারা নিষেধাজ্ঞা তুলে দেবে। হরমুজ প্রণালী আমাদের হাতে। আমরা চাইলে যে কোনো সময় তা বন্ধ করে দিতে পারি।”
১২ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন
বিদেশে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সম্পদের অর্ধেক ফেরত পাওয়ার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে স্বীকার করেন মোহাম্মাদি।
তবে তাঁর বক্তব্য ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমরা জানি আমেরিকা আমাদের টাকা দেবে না। কিন্তু আরব দেশগুলো এই অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তারা বাধ্য হবে তা দিতে। কারণ তারা এই অঞ্চলে ইরানের শক্তি দেখেছে।”
তাঁর মতে, এই চুক্তির অন্যতম ফল হলো আরব দেশগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কট্টরপন্থীদের প্রধান আপত্তি: হরমুজ প্রণালী
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। সংসদের কট্টরপন্থী সদস্য, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং প্রভাবশালী সংবাদপত্র কায়হান-এর সম্পাদক হোসেন শরীয়তমাদারী এই প্রশ্নে সরব হয়েছেন।
এক খোলা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকিই ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র। এর মাধ্যমে শত্রুপক্ষের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করা সম্ভব ছিল। তাহলে এখন কোন যুক্তিতে এই শক্তিশালী হাতিয়ার ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে?
তাঁর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেন, “তারা বলছে আমরা জাহাজ থেকে সার্ভিস চার্জ নেব! এত রক্তপাত, এত ক্ষয়ক্ষতির পর কি এটাই আমাদের প্রাপ্তি?”
ইজরায়েলি জাহাজ কি চলাচল করতে পারবে?
কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরু ও সংসদ সদস্য হাজাতোলেসলাম নাবোয়ানও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, এই চুক্তির ফলে কি ইজরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজও হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে পারবে?
তিনি বলেন, “এখন কি সব ইজরায়েলি জাহাজ, এমনকি শত্রু দেশগুলোর জাহাজও অবাধে চলাচল করবে? এটা কীভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রস্তাব হতে পারে?”
জনমত কার পক্ষে?
অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা বলছেন, কট্টরপন্থী ‘পায়দারি ফ্রন্ট’ মূলত যেকোনো সমঝোতারই বিরোধী। তারা সাধারণ ইরানিদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
সরকারপন্থী দৈনিক খোরাসান লিখেছে, যদি চুক্তিবিরোধীদের বিক্ষোভ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তাহলে চুক্তি সমর্থকদেরও একই সুযোগ দেওয়া উচিত। তাতে বোঝা যাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানি জনগণ যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষেই রয়েছে।
ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক পরীক্ষা
এই বিতর্ক শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও এটি একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।
সমালোচকদের অভিযোগ, দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের পর ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিই অর্জন করেছেন, যা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই আগে সম্ভব ছিল। ফলে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে এই সমঝোতা ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলের পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে ভালো।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুটি চুক্তির সরাসরি তুলনা করা কঠিন। ২০১৫ সালের চুক্তি ছিল একটি বিস্তারিত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। আর বর্তমান সমঝোতা মূলত যুদ্ধবিরতি ও সংঘাত বন্ধের প্রাথমিক কাঠামো নির্ধারণের জন্য তৈরি একটি স্মারক।
ফলে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা যেমন অনিশ্চিত, তেমনি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইও এখন মাত্র শুরু হয়েছে। কট্টরপন্থী ও সমঝোতাপন্থী শিবিরের এই সংঘর্ষই আগামী সপ্তাহগুলোতে ইরানের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।