শ্চিমবঙ্গে চলতি বছরে নথিভুক্ত ডেঙ্গি সংক্রমণ পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাবে মুর্শিদাবাদে আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজারের বেশি—রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্ষার জল জমে থাকা, অনিয়মিত আবর্জনা অপসারণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মশার প্রজননস্থল বাড়ার মধ্যে এই পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে সতর্ক করেছে।

ডেঙ্গির সরকারি সংখ্যা সাধারণত পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর হিসাব। জ্বর হলেও যাঁরা পরীক্ষা করাননি, বেসরকারি পরীক্ষাগারের তথ্য যাঁদের সময়মতো সরকারি ব্যবস্থায় আসেনি অথবা উপসর্গহীন সংক্রমণ—সবই এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে। তাই পাঁচ হাজারকে গোটা সংক্রমণের নির্ভুল সংখ্যা বলা যাবে না। আবার শুধু সম্ভাব্য অনথিভুক্ত রোগীর কথা বলে সরকারি হিসাবকে অকার্যকর বলাও ঠিক নয়; সময় ও জেলার সঙ্গে তুলনায় এই তথ্যই রোগের গতি বোঝার প্রধান উপায়।

মুর্শিদাবাদের পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় কারণ খুঁজতে হবে। নদী ও জলাভূমি, নির্মাণস্থলে জমা জল, জনঘনত্ব, পানীয় জলের পাত্র এবং পুরসভার পরিষেবার মধ্যে কোনগুলি প্রধান ভূমিকা নিচ্ছে, তা ওয়ার্ড ও ব্লকভিত্তিক তথ্য ছাড়া বোঝা যাবে না। জেলার মোট সংখ্যা বড় হলেই প্রতিটি এলাকার ঝুঁকি সমান নয়।

এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমা জলে জন্মায় এবং দিনের বেলায় কামড়ায়। শুধু নর্দমায় কীটনাশক ছড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণস্থল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ট্রে এবং ঢাকা না-থাকা জলাধার নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। মশা মারার ধোঁয়া সাময়িকভাবে পূর্ণবয়স্ক মশা কমালেও লার্ভার উৎস অক্ষত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যা ফিরে আসে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আতঙ্ক ও অবহেলা—দুই বিপদ রয়েছে। বেশির ভাগ ডেঙ্গি রোগী বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে সেরে ওঠেন। কিন্তু তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়। প্লেটলেটের সংখ্যা একমাত্র বিপদের সূচক নয়; রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া এবং অঙ্গের কার্যকারিতাও চিকিৎসকেরা দেখেন।

রাজ্যের সামনে এখন হাসপাতালের শয্যা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব রয়েছে। জেলা ও পুরসভাভিত্তিক দৈনিক সংখ্যা, মৃত্যু নিরীক্ষার ফল এবং মশার ঘনত্ব প্রকাশ করলে নাগরিকেরা ঝুঁকি বুঝতে পারবেন। সংখ্যা গোপন করার অভিযোগ যেমন আস্থা নষ্ট করে, প্রতিটি জ্বরকে ডেঙ্গি বলে আতঙ্ক ছড়ানোও ক্ষতিকর।

উৎসবের সময় মানুষের চলাচল বাড়বে। তাই কলকাতার বাইরে মুর্শিদাবাদসহ উচ্চঝুঁকির জেলাগুলিতে পরীক্ষাকেন্দ্র, রক্তব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। রোগীর সংখ্যা পাঁচ হাজার পেরোনো একটি সতর্কবার্তা; এখন প্রতিটি পাড়ায় প্রজননস্থল কমানোই সংক্রমণের রেখা নিচে নামানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।