কৈলাস–মানসরোবর যাত্রায় গিয়ে নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের একদল পর্যটক। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত খবর না মেলায় উদ্বেগ বাড়ছে পরিবারের। তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবে অমিল রয়েছে। দলে ছিলেন ৩১ জন পর্যটক এবং ভ্রমণ সংস্থার দুই ব্যবস্থাপক—সব মিলিয়ে ৩৩ জন। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত এনডিটিভির খবরে ৩০ জন পর্যটক ও দুই ব্যবস্থাপক মিলিয়ে ৩২ জনের কথা বলা হয়েছে। ফলে রাজ্যের ঠিক কতজনের খোঁজ মিলছে না, তা চূড়ান্ত তালিকা ছাড়া নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার ব্যবস্থাপনায় দলটি মানসরোবর যাত্রায় বেরিয়েছিল। নেপালের স্থানীয় সংস্থার সহযোগিতায় সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের। বুধবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ পর্যটকদের সঙ্গে শেষবার যোগাযোগ হয়েছিল বলে জানিয়েছে কলকাতার সংস্থা। তখন তাঁরা নেপাল–তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি ছিলেন। তার পর থেকেই আর তাঁদের অবস্থান জানা যাচ্ছে না। এই শেষ যোগাযোগের সময় ও জায়গাই এখন অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। রাজ্য প্রশাসনের তরফে নেপাল দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও খবর।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে এক আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, কলকাতার দলটি তিব্বতে প্রবেশের জন্য রাসুয়াগড়ি পৌঁছেছিল। বিপর্যয়ের আগে সদস্যেরা সীমান্তের অভিবাসন দফতরে ছিলেন। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া এক বিষয় নয়। তাঁদের প্রত্যেকের কী হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। উদ্ধারকারী দল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া কোনও ব্যক্তির মৃত্যু কিংবা আহত হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছনো তাই অনুচিত।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই হুগলির আরামবাগ থেকে যাওয়া আরও ৬৫ জন পর্যটকের আটকে থাকার খবর পাওয়া গিয়েছে। তাঁরা চেতনপার্ক এলাকায় রয়েছেন এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন। তাঁদের অবস্থানের জায়গায় বন্যার তীব্রতা তুলনামূলক কম। ফলে এই দলটিকে যোগাযোগহীন পর্যটকদের সঙ্গে একই নিখোঁজের হিসাবে যুক্ত করা ঠিক হবে না। আপাতত তাঁদের দেশে ফেরার অপেক্ষা। কারা নিরাপদে আটকে রয়েছেন এবং কারা সম্পূর্ণ যোগাযোগের বাইরে, সেই পৃথক তথ্য পরিবারগুলির উদ্বেগ কমাতে বিশেষ প্রয়োজন।

বুধবারের বিপর্যয়ে নেপালের রাসুয়া ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসা জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত জনবসতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় আঘাত হানে। বৃহস্পতিবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬২ বলা হয়েছে। বহু বিদেশি পর্যটকেরও খোঁজ চলছে। কৈলাস ও মানসরোবরের যাত্রাপথ হওয়ায় বিপর্যস্ত এলাকায় বিভিন্ন দেশের তীর্থযাত্রীদের উপস্থিতি ছিল। সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি তাঁদের সন্ধান এবং উদ্ধার—দুই কাজকেই কঠিন করে তুলেছে।

ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপ্তি সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিবরণও উদ্বেগজনক। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে রাসুয়ার এক স্বাস্থ্যকর্মীর বক্তব্য উঠে এসেছে, নদীতীরের বসতিগুলি ভেসে গিয়েছে এবং তাঁর নিজের আত্মীয়দেরও খোঁজ মিলছে না। সেতু ও বিদ্যুতের পরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি উপদ্রুত এলাকায় পৌঁছনোর সমস্যাও রয়েছে। প্রবল জলস্রোতের কারণে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নামানো কঠিন হয়ে পড়ার খবর এসেছে। ফলে শুধু আকাশপথে নজরদারি করলেই হচ্ছে না; বিপন্ন মানুষকে কোথা থেকে, কীভাবে নিরাপদে সরানো যাবে, সেই বাধাও অতিক্রম করতে হচ্ছে।

নেপালের সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ এবং পুলিশ উদ্ধার অভিযানে নেমেছে। কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাসও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে। ভারত ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠিয়েছে। বিপর্যয়ের উৎস সম্পর্কে প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, হিমবাহের অংশ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহই সংশ্লিষ্ট ভূকম্পনের কারণ। প্রাথমিক অনুমান সংশোধিত হওয়ায় দুর্যোগের ব্যাখ্যাতেও সতর্কতা প্রয়োজন।

ভারতীয়দের সাহায্যের জন্য কাঠমান্ডুর দূতাবাস এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে সহায়তা ব্যবস্থা চালু হওয়ার খবরও পাওয়া গিয়েছে। নেপালে বিপন্ন ভারতীয়দের মধ্যে শুধু বাংলার বাসিন্দারাই নন, অন্য রাজ্য থেকে যাওয়া তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। ফলে একাধিক প্রশাসন, ভ্রমণ সংস্থা এবং পরিবারের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। একই ব্যক্তির নাম একাধিক তালিকায় থাকা কিংবা নিরাপদে পৌঁছনোর খবর পরে আসার সম্ভাবনাও হিসাব তৈরির সময় মাথায় রাখা দরকার।

বাংলার পরিবারগুলির কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি স্বজনদের সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য খবর। অনুসন্ধানের সুবিধার্থে যাত্রীর নাম, পরিচয়পত্রের তথ্য, ভ্রমণসূচি, সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং শেষ যোগাযোগের স্থান একত্র করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও নিখোঁজ, আটকে থাকা ও উদ্ধার হওয়া মানুষদের পৃথকভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। সংখ্যার অমিল যেন ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের কাজকে আড়াল না করে।

মানসরোবরের পথে যাওয়া দলটির প্রত্যেক সদস্যের অবস্থান জানা না পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটবে না। এই মুহূর্তে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নিয়মিত, যাচাই করা তথ্য প্রকাশও সমান প্রয়োজন—যাতে পরিবারগুলি গুজবের বদলে নিশ্চিত খবর পায় এবং প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় অন্তত বাস্তব পরিস্থিতি জানতে পারে।