Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: গত সপ্তাহে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্র ও পুলিশকর্মীদের আহত হওয়ার অভিযোগের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মঙ্গলবার পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ঘটনার তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হতে পারে। এ বিষয়ে কেন্দ্র সরকার, দিল্লির জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (এনসিটি) প্রশাসন এবং অসম, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও কেরল সরকারের কাছে আদালত জবাব চেয়েছে।
একই সঙ্গে আদালত একাধিক অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি করেছে। বিশেষ করে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার বা আটক হওয়া ১৮ বছরের কম বয়সি এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক অতীত নেই, এমন সব নাবালককে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, বিক্ষোভ-সংক্রান্ত সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোনে ধারণ করা ভিডিও, পুলিশ সদস্যদের দেহে থাকা ক্যামেরার রেকর্ডিং, ওয়্যারলেস যোগাযোগের নথি এবং পুলিশ কন্ট্রোল রুম (পিসিআর)-এর লগবুক সংরক্ষণ করতে হবে।
এ ছাড়া আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে এবং আপাতত তা কোনওভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না। বিক্ষোভকারীদের ব্যক্তিগত পরিচয় বা তথ্য প্রকাশ থেকেও বিরত থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ইতিমধ্যে যে এফআইআরগুলি দায়ের হয়েছে, সেগুলির তদন্ত সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলি চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যেসব ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক অতীত নেই, তাদের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
কোন বেঞ্চে শুনানি
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ একাধিক জনস্বার্থ মামলার শুনানি করে। এসব আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০ জুলাই থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছাত্রদের আন্দোলনের সময় পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। একই সঙ্গে আহত পুলিশকর্মী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও কয়েকটি আবেদন আদালতে জমা পড়েছে।
বেঞ্চ তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে—
“আবেদনকারীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলি প্রাথমিকভাবে এমন একটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ঘটনাগুলির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। এই ধরনের তদন্ত যেমন আবেদনকারীদের অভিযোগের যথাযথ উত্তর দেবে, তেমনই আহত পুলিশকর্মীদের পরিবারের উদ্বেগ এবং সলিসিটর জেনারেলের উত্থাপিত বিষয়গুলিও যথাযথভাবে বিবেচিত হবে।”
আদালতকক্ষের শুনানি
আবেদনকারী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশি আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আদালতের সামনে একাধিক আবেদন এসেছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে—
- বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার লাঠি ব্যবহার করা হয়েছে;
- ১৯ বছরের এক তরুণী প্রাণঘাতীভাবে আহত হয়েছেন;
- পেলেট গানের গুলিতে অনেকে জখম হয়েছেন;
- এক আইনজীবীর উপর হামলা হয়েছে;
- সাধারণ পোশাকে থাকা পুলিশকর্মীরা মারধর করেছেন;
- তরুণীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে;
- পেরেক লাগানো লাঠি ব্যবহার করা হয়েছে।
এই সব অভিযোগের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন—
“শুরুতে এটি ছিল ছাত্রদের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। সংবিধান এই ধরনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু দু’টি বিষয় ঘটতে পারে। এক, আন্দোলন বানচাল করার উদ্দেশ্যে বাইরের লোকজন আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে হিংসা ছড়াতে পারে। অর্থাৎ অনাহূত লোকজনও আন্দোলনে প্রবেশ করতে পারে। দুই, আহত পুলিশকর্মীদের পক্ষ থেকেও আবেদন এসেছে। তাই প্রশ্ন হল—এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন তদন্ত কেন হবে না?”
গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে বলেন, যন্তর-মন্তর এলাকায় বিক্ষোভের সময় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ১৬৩ ধারার (আগের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা) অধীনে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল না।
তিনি আদালতকে স্মরণ করিয়ে দেন, রামলীলা ময়দান সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পুলিশকে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ধাপভিত্তিক নীতি নির্ধারণ করেছিল। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী—
- প্রথমে লাউডস্পিকারে সতর্কবার্তা দিতে হবে;
- তারপর প্রয়োজনে জলকামান ব্যবহার করতে হবে;
- এরপর হাঁটুর নীচে লাঠিচার্জ করা যেতে পারে;
- সবশেষে, একান্ত প্রয়োজন হলে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা কোথাও মানা হয়নি। বরং পরিচয়পত্র বা নামফলকবিহীন এবং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পোশাকে থাকা পুলিশকর্মীরা আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, অসংখ্য ভিডিওতে এই ঘটনাগুলির প্রমাণ রয়েছে।
এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন,
“যে-ই সীমা লঙ্ঘন করে থাকুক, যে-ই নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার করে থাকুক, আইন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দায়িত্ব নির্ধারণ না হলে তদন্তের কোনও অর্থ থাকে না।”
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে তদন্তের প্রস্তাব
গোপাল শঙ্করনারায়ণন প্রস্তাব দেন, তদন্তটি একজন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সম্ভব হলে কোনও প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি শুনানি শুরু করার পরও বিহারে এক পুলিশ আধিকারিক ছাত্রদের বিরুদ্ধে একে–৪৭ রাইফেল ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর মতে, এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট, প্রশাসনের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
পুলিশি নীতিমালা নতুন করে পর্যালোচনার ইঙ্গিত
এই সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত পুরনো নির্দেশিকাগুলি নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন হতে পারে।
শক ব্যাটন, পুলিশকর্তার চড় এবং মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি
অন্য একটি মামলায় আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী শ্যাম দিবান আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার লাঠি ব্যবহার করা হয়েছে। এমন ভিডিও রয়েছে যেখানে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ আধিকারিক এক মহিলা আন্দোলনকারীকে চড় মারছেন।
দিবান আরও বলেন, আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক পুলিশকর্মী কয়েকজন তরুণকে হুমকি দিচ্ছেন যে, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত মিথ্যা মামলা দায়ের করে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি আদালতের কাছে অন্তর্বর্তী নির্দেশ চেয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে, তা যেন কোনওভাবেই প্রকাশ করা না হয়।
শক্তিশালী সর্বভারতীয় প্রোটোকলের প্রয়োজন
প্রধান বিচারপতি বলেন, স্বাধীন তদন্তের পাশাপাশি অতীতের বিভিন্ন রায়ে নির্ধারিত নীতিগুলিকে একত্রিত করে সারা দেশের জন্য একটি শক্তিশালী ও অভিন্ন পুলিশি প্রোটোকল তৈরির সময় এসেছে।
বিহারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল: শাদান ফরাসত
প্রবীণ আইনজীবী শাদান ফরাসত আদালতে বলেন, দিল্লির তুলনায় বিহারে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেশি ছিল।
তাঁর বক্তব্য, এখনও প্রায় ১৫০ জন আটক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নাবালক। তাঁদের গ্রেফতারের ৪৮ ঘণ্টা পর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিহার সরকার আগের রাতে মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেও আটক ব্যক্তিদের তখনও মুক্তি দেওয়া হয়নি।
ফরাসতের আরও অভিযোগ, দিল্লিতে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পরও কয়েকজন আইনজীবীকে পুলিশ মারধর করেছে।
খাদ্য বিতরণকারী স্বেচ্ছাসেবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ আদালতে জুনায়েদ মালিক নামে এক স্বেচ্ছাসেবকের আবেদন তুলে ধরেন।
জুনায়েদ আন্দোলনস্থলে খাবার বিতরণের কাজ করছিলেন। অভিযোগ, পুলিশ তাঁকে আটক করে অনেক দূরে মুসৌরিতে গিয়ে নামিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও হয়রানি ও আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রশান্ত ভূষণ আরও দাবি করেন, আন্দোলনের দিন ভোরে যন্তর-মন্তরে একটি ট্রাকভর্তি পাথর এনে রাখা হয়েছিল।
প্রধান বিচারপতি বলেন, পুলিশের দাবি, ওই ট্রাকটি আন্দোলনকারীরাই এনেছিল।
এর জবাবে আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার বলেন,
“যদি এত কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেও একটি ট্রাক সেখানে পৌঁছে যেতে পারে, তাহলে সেটাই আরও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।”
এই বক্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি বলেন,
“প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তার একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তৈরি হয়েছে।”
প্রবীণ আইনজীবী এন. হরিহরণ আদালতের কাছে প্রস্তাব রাখেন, একই বিষয় নিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে যে মামলাগুলি বিচারাধীন রয়েছে, সেগুলিও সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তর করা হোক, যাতে এক জায়গা থেকেই সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
তিনি বলেন, দিল্লি হাই কোর্ট ইতিমধ্যেই যে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে সমস্ত ইলেকট্রনিক নথি ও তথ্য সংরক্ষণের কথা বলেছে, তা বহাল রাখা উচিত।
পেলেট গানে আহতদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার বলেন, শুধু ভিডিও বা সিসিটিভি ফুটেজ নয়, পুলিশের লগবুক, জেনারেল ডায়েরি (জিডি) এবং অন্যান্য সরকারি নথিও সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন।
কেন্দ্র সরকারের বক্তব্য
কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, এই মামলায় মূলত দু’ধরনের আবেদন রয়েছে। একদিকে ছাত্রদের আহত হওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে পুলিশকর্মীদের আহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তিনি বলেন,
“যদি ছাত্রদের উপর হামলা হয়ে থাকে, তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। সরকার কোনওভাবেই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।”
সলিসিটর জেনারেল জানান, প্রায় ২৫০ জন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, ছাত্ররাই পুলিশকে আক্রমণ করেছেন এমনটা তিনি মনে করেন না। বরং সমাজবিরোধী কিছু ব্যক্তি আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও জানান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির তত্ত্বাবধানে স্বাধীন তদন্তের যে প্রস্তাব আদালত দিয়েছে, তাতে কেন্দ্র সরকারের কোনও আপত্তি নেই।
আহত পুলিশকর্মীদের পক্ষের বক্তব্য
আহত পুলিশকর্মীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী শ্রীধর পোতারাজু।
তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে নারী ও পুরুষ—উভয় পুলিশকর্মীর উপর হামলা চালানো হয়েছে।
এই সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি মন্তব্য করেন, বড় ধরনের বিক্ষোভ মোকাবিলার সময় পুলিশকর্মীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, বিশেষ করে হেলমেট ও প্রতিরক্ষামূলক পোশাক থাকা উচিত।
এর জবাবে গোপাল শঙ্করনারায়ণন বলেন,
“পুলিশের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছিল না এটা ঠিক। কিন্তু ছাত্রদের তো কোনও সুরক্ষা সরঞ্জামই ছিল না।”
মুখ চিনে নজরদারির অভিযোগ
শুনানির সময় গোপাল শঙ্করনারায়ণন আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা এবং ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের প্রোফাইল তৈরি বা নজরদারি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হোক।
আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ
আদালত যে অন্তর্বর্তী নির্দেশগুলি জারি করেছে, তার সারাংশ নিম্নরূপ—
১. সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ
যদিও সলিসিটর জেনারেল ইতিমধ্যেই আদালতে জানিয়েছেন যে প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, তবু অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে আদালত নির্দেশ দিয়েছে—
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত—
- সিসিটিভি ফুটেজ,
- ড্রোনে ধারণ করা ভিডিও,
- দেহে পরিধানযোগ্য ক্যামেরার রেকর্ডিং,
- অন্যান্য ভিডিওগ্রাফি,
- ওয়্যারলেস যোগাযোগের রেকর্ড,
- পিসিআর লগ ও সংশ্লিষ্ট নথি
অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে।
২. ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হবে
পুলিশ বা প্রশাসন আন্দোলনকারীদের যে ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করেছে, তা নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে।
এই তথ্য আপাতত কোনওভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করা যাবে না।
৩. পরিচয় প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা
রাজ্য সরকার বা পুলিশ প্রশাসন কোনও আন্দোলনকারীর, বিশেষ করে ছাত্রদের, ব্যক্তিগত তথ্য বা পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না।
৪. তদন্ত চলবে, কিন্তু জবরদস্তি নয়
দিল্লি এবং অন্যান্য রাজ্য ইতিমধ্যেই যে এফআইআরগুলি দায়ের করেছে, সেগুলির তদন্ত চলতে পারবে।
তবে যেসব ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক অতীত নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার, জেরা বা অন্য কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
এই সুরক্ষা অবশ্য অপরাধমূলক অতীত রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
৫. নাবালকদের মুক্তি
আদালত সমস্ত রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে—
১৮ বছরের কম বয়সি যেসব শিশু বা কিশোরকে আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেফতার বা আটক করা হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনও অপরাধের রেকর্ড নেই, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
প্রয়োজনে তাঁদের নিজের বা পরিবারের সদস্যদের একটি সাধারণ বন্ডে স্বাক্ষর নেওয়ার পর ছেড়ে দিতে হবে, যদি জামিনের শর্ত হিসেবে তা প্রয়োজন হয়।
এর একদিন আগে, মামলাটি উল্লেখ করা হলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মৌখিকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদ করার অধিকার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার।
তিনি বলেছিলেন, শুধুমাত্র মানুষ বিক্ষোভ করছে বলেই তাদের উপর লাঠিচার্জ চালানো যায় না।
প্রধান বিচারপতির কথায়,
“শান্তিপূর্ণ এবং আইনসম্মত প্রতিবাদের অধিকার সংবিধান সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন শান্তিপূর্ণ, ততক্ষণ কেবল বিক্ষোভ হচ্ছে—এই কারণেই বলপ্রয়োগ করা যায় না। যদি কোথাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়ে থাকে, তবে তার স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত। এটি শুধু দিল্লির ঘটনা নয়। সারা দেশে বিক্ষোভ মোকাবিলার জন্য অভিন্ন পুলিশি নীতিমালা প্রয়োজন। আন্দোলন হলেই লাঠিচার্জ—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা রক্ষারও নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা দরকার।”
পুলিশকর্মীদের সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন
আদালত আরও ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে কেন বড় ধরনের বিক্ষোভ সামলানোর সময় পুলিশকর্মীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, যেমন প্রতিরক্ষামূলক হেলমেট ও অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়া হয় না।
কীভাবে সুপ্রিম কোর্টে এল এই মামলা
গত শুক্রবার প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের সামনে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে উত্থাপন করেন।
তিনি জানান, চলমান ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তাই বিষয়টির জরুরি শুনানি প্রয়োজন।
এর পরই প্রধান বিচারপতি জানান, আদালত বিষয়টি শুনানির জন্য গ্রহণ করবে।
প্রথমে কেন শুনানি হয়নি
এর আগে, ২২ জুলাই আইনজীবী নরেন্দ্র মিশ্র একটি চিঠিকে জনস্বার্থ মামলা হিসেবে গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে ২০ জুলাই যন্তর-মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
তখন প্রধান বিচারপতি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
পরে তিনি স্পষ্ট করেন, সে সময় আদালতের সামনে কোনও নিয়মমাফিক দায়ের করা আবেদন ছিল না। তাই চিঠির ভিত্তিতে শুনানি শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আবেদনকারীরা কী দাবি করেছেন
শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর আবেদন
অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড চাঁদ কুরেশির মাধ্যমে আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী যে আবেদন করেছেন, তাতে জনসমাবেশ ও বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে—
- ভিড় নিয়ন্ত্রণের কাজে সাধারণ পোশাক পরা ব্যক্তিদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হোক।
- ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা প্রয়োগের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করা হোক।
- ২০ জুলাই দিল্লির বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকার স্বাধীন তদন্ত করা হোক।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ জুলাই ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদের দিকে মিছিল করেন।
তাদের অভিযোগ, পুলিশ ব্যাপক সংখ্যায় মোতায়েন করা হয়, চারদিকে ব্যারিকেড বসানো হয়, টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়, লাঠিচার্জ করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে—
- আন্দোলনকারীদের শারীরিকভাবে মারধর করা হয়েছে;
- মহিলা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক অসদাচরণ করা হয়েছে;
- সাধারণ পোশাকে থাকা বা পরিচয়বিহীন ব্যক্তিরাও বলপ্রয়োগে অংশ নিয়েছেন;
- অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন।
এই সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলেই আবেদনকারীর দাবি।
এ ছাড়া আবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করার ফলে অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী, রোগী এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, টেলিমেডিসিন, বাড়ি থেকে কাজ এবং জরুরি পরিষেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মনোজ ঝার আবেদন
রাজ্যসভার সাংসদ মনোজ ঝা পৃথক একটি আবেদনে আদালতের কাছে আবেদন করেন—
২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে, বিশেষ করে ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর-মন্তরে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি নির্যাতন ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকে এফআইআর দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হোক।
তিনি আরও প্রস্তাব দেন—
প্রত্যেক রাজ্যে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হোক। সেই দলে থাকবেন—
- সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজিপি);
- অন্তত দু’জন মহিলা আইপিএস আধিকারিক, যাঁদের পদমর্যাদা পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজি) নিচে হবে না।
তদন্ত যাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়, তার জন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতির তত্ত্বাবধানে তদন্ত পরিচালনা এবং সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার আবেদনও জানানো হয়েছে।
তিনি আরও আবেদন করেছেন—
- সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সমস্ত ভিডিও সংরক্ষণ করতে হবে;
- ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত প্রত্যেক পুলিশকর্মী—সাধারণ পোশাকে থাকা ব্যক্তিরাও—কারা ছিলেন, তা চিহ্নিত করতে হবে।
আইনজীবীর উপর হামলার অভিযোগ
আরও একটি আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, একজন আইনজীবী ২৩ জুলাই যন্তর-মন্তরের আন্দোলনে আটক ছাত্রদের মুক্তির বিষয়ে কথা বলতে নিজামুদ্দিন থানায় গেলে দিল্লি পুলিশ তাঁকে মারধর করে এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে।
এই ঘটনাতেও আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।