মুখস্থের খাতা বন্ধ? স্কুলশিক্ষায় বড় বদলের পথে বাংলা

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় এবার বড়সড় বদলের প্রস্তুতি।
- প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ—পুরো শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পড়ানোর ধরন নতুন করে খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের একটি সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটি গঠন করল রাজ্য…
- জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০ এবং জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো (এনসিএফ)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যের স্কুলশিক্ষাকে আরও আধুনিক, বাস্তবমুখী এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তোলাই এই উদ্যোগের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় এবার বড়সড় বদলের প্রস্তুতি। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ—পুরো শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পড়ানোর ধরন নতুন করে খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের একটি সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটি গঠন করল রাজ্য সরকার।
জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০ এবং জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামো (এনসিএফ)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্যের স্কুলশিক্ষাকে আরও আধুনিক, বাস্তবমুখী এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
স্কুলশিক্ষা দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক—তিন স্তরের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে কমিটি। শুধু সিলেবাসে কিছু বিষয় যোগ-বিয়োগ নয়, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার কাঠামোতেও বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হতে পারে।
মুখস্থ নয়, বুঝে শেখার ওপর জোর
দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য মুখস্থবিদ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার অভিযোগ রয়েছে। নতুন কমিটির অন্যতম লক্ষ্য তাই এই প্রবণতা বদলানো। ধারণাভিত্তিক শিক্ষা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশে জোর দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে কমিটি।
অর্থাৎ, পরীক্ষায় শুধু ‘কী মুখস্থ আছে’ তা নয়—‘কতটা বুঝেছে’ এবং ‘বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাতে পারে’, সেদিকেও নজর দেওয়ার চেষ্টা হবে।
কমবে পরীক্ষার চাপ?
পড়ুয়াদের মানসিক চাপ কমানোও এই সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য। পরীক্ষা, নম্বর এবং প্রতিযোগিতার চাপ যে বহু শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে, তা মাথায় রেখে আরও বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষার্থী-বান্ধব মূল্যায়ন পদ্ধতির সুপারিশ করা হতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত ও পৃথক মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
কোচিং সংস্কৃতিতে লাগাম?
স্কুলে মানসম্পন্ন পড়াশোনা নিশ্চিত করে বেসরকারি কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোও কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। শ্রেণিকক্ষেই যাতে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলি ভালোভাবে বুঝতে পারে, সেই অনুযায়ী শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে।
অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সফল শিক্ষামডেল পর্যালোচনা করে রাজ্যের প্রেক্ষাপটে উপযোগী পদ্ধতিগুলি গ্রহণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
বদলাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণও
শুধু পড়ুয়া নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করবে কমিটি। পাঠ্যবইনির্ভর একমুখী পড়ানোর বদলে এমন শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হবে, যা পড়ুয়াদের কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক মনোভাবকে উৎসাহিত করবে।
শিক্ষকরা যাতে শুধু তথ্য না পড়িয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে শেখাতে পারেন, তার জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
কারা রয়েছেন কমিটিতে?
কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়কে। সদস্য-সচিব হিসেবে থাকবেন স্কুলশিক্ষা দফতরের প্রশাসনিক আধিকারিক তথা যুগ্ম অধিকর্তা (পদাধিকারবলে) অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়।
কমিটিতে থাকছেন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতিরা। এছাড়াও রাজ্য শিক্ষাগত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদ (এসসিইআরটি)-এর অধিকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষাবিদ, স্কুলের অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিষয়বিশেষজ্ঞ এবং মেন্টরদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাঁচ মাসের মধ্যে রিপোর্ট
প্রথম বৈঠকের দু’মাসের মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে হবে কমিটিকে। এরপর শিক্ষা ক্ষেত্রের বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে সেই রিপোর্ট সংশোধন করে আরও তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা।
শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বদলে বাস্তবমুখী জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং যুক্তিবোধ গড়ে তোলার দিকে এগোতে পারে শিক্ষাব্যবস্থা।
তবে সুপারিশগুলি বাস্তবে কবে কার্যকর হবে, নতুন পাঠ্যক্রম কবে থেকে চালু হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কতটা সহজে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন—তার উত্তর মিলবে কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্টের পরেই।
এখন প্রশ্ন একটাই—বাংলার স্কুলে কি সত্যিই এবার ‘মুখস্থ করো, লিখে দাও’ যুগের অবসান হতে চলেছে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



