হাইলাইটস:
- মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি ভারতের পরিচালনাধীন শাহিদ বেহেশতি টার্মিনাল: বিদেশ মন্ত্রক
- পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে অসামরিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্য না করার আহ্বান ভারতের
- চাবাহার বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রয়েছে
- হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেও চাবাহার ভারতের মধ্য এশিয়া সংযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা
বাংলাস্ফিয়ার: ইরান-আমেরিকা সংঘাত ফের তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য স্বস্তির খবর। ইরানের চাবাহার বন্দরের শাহিদ বেহেশতি টার্মিনাল, যেখানে ভারতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে এবং যা ভারত পরিচালনা করছে, তা সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলায় কোনও ক্ষতির মুখে পড়েনি বলে জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে কোনও পক্ষেরই অসামরিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা উচিত নয়।
শুক্রবার সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, চাবাহার বন্দরে হামলার খবর সরকার দেখেছে। তবে ভারতের পরিচালিত শাহিদ বেহেশতি টার্মিনালের কোনও ক্ষতি হয়নি। ফলে সেখানে ভারতের বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক কার্যক্রম আপাতত স্বাভাবিক রয়েছে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংঘর্ষ নতুন করে শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালায়। সেই অভিযানে বন্দর নগরী বান্দার আব্বাসের পাশাপাশি চাবাহার বন্দর এলাকাও লক্ষ্যবস্তু হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে চাবাহার বন্দরের একটি সামুদ্রিক ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ধসে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল চাবাহারের সেই টার্মিনাল, যা ভারতের মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। পাকিস্তানকে এড়িয়ে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার বাজারে পৌঁছানোর জন্য বহু বছর ধরেই ভারত এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে।
২০২৪ সালে ভারত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্থা আইপিজিএল (ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড) শাহিদ বেহেশতি টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই চুক্তিকে ভারতের পশ্চিমমুখী সংযোগ নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
চাবাহার বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডরের (আইএনএসটিসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও এই বন্দরকে বিবেচনা করা হয়। ভারত, ইরান, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে পণ্য পরিবহণের সময় ও ব্যয় কমাতে এই করিডরের বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে চাবাহারে কোনও বড় ক্ষতি হলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাও ধাক্কা খেতে পারত।
ভারত তাই সংঘাতের মধ্যেও বারবার সংযমের আহ্বান জানাচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে অসামরিক পরিকাঠামোকে নিরাপদ রাখা সব পক্ষেরই দায়িত্ব। বন্দর, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা বেসামরিক পরিবহণ ব্যবস্থার উপর হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও বিপন্ন করতে পারে বলে ভারতের উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাবাহার ভারতের কাছে শুধু একটি বন্দর নয়, বরং একটি ভূ-কৌশলগত বিনিয়োগ। পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে চাবাহার ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। সেই কারণেই সংঘাতের আবহেও এই প্রকল্পকে সচল রাখা ভারতের অগ্রাধিকার।
তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থির। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় গোটা অঞ্চলের জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর চাপ বাড়ছে। ভারতের তেল আমদানির একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় নয়াদিল্লি পরিস্থিতির উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।
বিদেশ মন্ত্রক আপাতত জানিয়েছে, ভারতের পরিচালিত শাহিদ বেহেশতি টার্মিনাল নিরাপদ রয়েছে এবং সেখানে কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই। তবে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা।