হাইলাইটস:
- ইসরোর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসর সহজে গ্রহণ না করার নির্দেশ।
- সাম্প্রতিক মাসগুলিতে শতাধিক বিজ্ঞানী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে খবর।
- গগনযান-সহ জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্পে কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় পদক্ষেপ।
- প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে বিবেচনা করবে মহাকাশ দফতর।
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের প্রথম মানব মহাকাশ অভিযান গগনযান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ প্রকল্পের অগ্রগতি যাতে ব্যাহত না হয়, সেই লক্ষ্যেই ইসরো (ISRO)-র বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের পদত্যাগের ক্ষেত্রে কড়া অবস্থান নিল কেন্দ্র। মহাকাশ দফতর (Department of Space) ইসরোর বিভিন্ন কেন্দ্রে একটি স্মারক জারি করে জানিয়েছে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসর (Voluntary Retirement) সংক্রান্ত আবেদন আর রুটিনভাবে গ্রহণ করা যাবে না।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে শতাধিক বিজ্ঞানী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে খবর সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন কেন্দ্র সরকার। কারণ, দেশের মহাকাশ কর্মসূচির একাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
মঙ্গলবার জারি হওয়া স্মারকে বলা হয়েছে, ইদানীং ইসরোর গ্রুপ ‘এ’ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের মধ্যে স্বেচ্ছাবসর এবং পদত্যাগের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গগনযান এবং অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত কর্মীদের এই প্রবণতা প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
স্মারকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “সাম্প্রতিক সময়ে গগনযান-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত গ্রুপ ‘এ’ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যায় পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরের আবেদন জমা পড়ছে। এর ফলে জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।”
এই নির্দেশ মূলত গ্রুপ ‘এ’ শ্রেণির বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ, ইসরোর গবেষণা, নকশা, উৎক্ষেপণ, মহাকাশযান নির্মাণ এবং মিশন পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেই এই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।
সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনও বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রধানরা তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন দিতে পারবেন না। প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে তাঁর ভূমিকা, বিকল্প কর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি মহাকাশ দফতরের উচ্চপর্যায়েও পাঠানো হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ, স্টার্টআপের উত্থান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে আকর্ষণীয় বেতন ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির ফলে বহু দক্ষ বিজ্ঞানী সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়ার কথা ভাবছেন। ইসরোতে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম বেতন, সীমিত পদোন্নতির সুযোগ এবং কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও কর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষের কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
তবে কেন্দ্রের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দক্ষ বিজ্ঞানীদের একসঙ্গে হারালে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের কৌশলগত এবং বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির ওপর। গগনযান ছাড়াও চন্দ্রাভিযান, সৌর গবেষণা, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ, উৎক্ষেপণযান উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ অভিযানের মতো প্রকল্পে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গগনযান প্রকল্প ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক হতে চলেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে মহাকাশচারীকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী পর্যায়গুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সময়ে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের চলে যাওয়া প্রকল্পের সময়সূচি ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
ইসরো গত এক দশকে চন্দ্রযান-৩, আদিত্য-এল১, স্পেস ডকিং প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযান এবং বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
তবে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, শুধু পদত্যাগে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বিজ্ঞানীদের কর্মপরিবেশ, গবেষণার স্বাধীনতা, বেতন, পদোন্নতির সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত বিকাশের বিষয়গুলিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নতুন নির্দেশের ফলে আপাতত ইসরোর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীদের পদত্যাগের আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে জাতীয় মহাকাশ কর্মসূচির গতি বজায় থাকবে এবং গগনযানের মতো ঐতিহাসিক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।