বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুদ্ধপ্রযুক্তির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল আমেরিকা। প্রথমবারের মতো বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠে চলাচলকারী মানববিহীন আক্রমণকারী নৌযান (Unmanned Surface Vessel বা USV) ব্যবহার করে ইরানের একটি সাবমেরিন ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এই অভিযানের ভিডিওও প্রকাশ করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)।

সোমবার সেন্টকমের সরকারি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে জানানো হয়, রবিবার পরিচালিত অভিযানে তিনটি ‘করসেয়ার’ (Corsair) একমুখী আক্রমণকারী সি-ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এই ড্রোনগুলি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বান্দার আব্বাস নৌঘাঁটির একটি সাবমেরিন ও জাহাজ মেরামত কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রথম মার্কিন বাহিনী সমুদ্রপৃষ্ঠে চলা ড্রোনকে সরাসরি আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল।

সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “একাধিক একমুখী আক্রমণকারী সারফেস ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের সাবমেরিন ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। তিনটি করসেয়ার মানববিহীন সারফেস ভেসেল বান্দার আব্বাস নৌঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।”

বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলার ক্ষমতা কমানোর দাবি

মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানের নৌ-সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর হামলা চালানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলার ফলে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ভবিষ্যৎ হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনী এবং ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বান্দার আব্বাস?

ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিগুলির মধ্যে অন্যতম বান্দার আব্বাস। এখানেই মোতায়েন থাকে ইরানের নৌবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ, সাবমেরিন বহর এবং বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রবাহী দ্রুতগতির যুদ্ধজাহাজ।

হরমুজ প্রণালীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের সামুদ্রিক তেল পরিবহণের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। ফলে এই ঘাঁটিতে হামলা ইরানের সামরিক পরিকাঠামোর পাশাপাশি তার সামুদ্রিক কৌশলের উপরও বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কী এই সি-ড্রোন?

সাধারণ ড্রোন যেমন আকাশে উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, তেমনই সি-ড্রোন বা Unmanned Surface Vessel (USV) সমুদ্রের উপরিভাগে চালিত হয়। এগুলি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় অথবা আগে থেকেই নির্ধারিত পথ অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত করসেয়ার ড্রোনগুলি একমুখী আক্রমণকারী প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ এগুলি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে নিজেই বিস্ফোরিত হয়। ফলে তুলনামূলক কম খরচে এবং সৈন্যদের ঝুঁকিতে না ফেলে উচ্চমূল্যের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা সম্ভব।

যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে মানববিহীন প্রযুক্তি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আকাশে ড্রোন যুদ্ধের চেহারা বদলে দিতে পারে। এবার মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠে ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সেই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আরও একধাপ এগোল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে সমুদ্রযুদ্ধে মানববিহীন নৌযানের ব্যবহার দ্রুত বাড়বে। কারণ এগুলি তুলনামূলক সস্তা, শনাক্ত করা কঠিন এবং বড় যুদ্ধজাহাজ বা নৌঘাঁটির বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা

ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতায় এই হামলা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

যদিও এই হামলার পরপরই ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি, তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সমুদ্রে মানববিহীন অস্ত্র ব্যবহারের এই নজির ভবিষ্যতে সংঘাতকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আধুনিক যুদ্ধ ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, যেখানে মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মই সংঘর্ষের মূল অস্ত্র হয়ে উঠছে।