Table of Contents
সরকারি সম্প্রচার সংস্থা ভেঙে পড়ার পর শত শত সাংবাদিকের পেশা বদল; কেউ ট্রেডার জো’জে কর্মী, কেউ বারিস্তা, কেউ রিয়েল এস্টেট এজেন্ট
বাংলাস্ফিয়ার: একসময় রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠস্বর ছিলেন দানিলা গালপেরোভিচ। আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্প্রচারক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল সুদূরপ্রসারী। কিন্তু আজ তিনি আমেরিকার ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে একটি মুদি বিপণি—ট্রেডার জো’জে—তাক সাজান, ক্রেতাদের ব্যাগ গুছিয়ে দেন এবং ফরাসি ওয়াইন সম্পর্কে পরামর্শ দেন।
তাঁর কথায়, “আগে অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতাম। কিন্তু এখন যে মানুষগুলোর সঙ্গে কাজ করি, যে পরিবেশে আছি এবং যে স্বাস্থ্যবিমা পাচ্ছি—সব মিলিয়ে এটাও এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।”
এই পরিবর্তন কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, যার ফলে কার্যত ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ)।
ট্রাম্পের নির্দেশে বিপর্যয়
২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ভিওএ-র মূল সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়া (ইউএসএজিএম)-কে আইনে যতটুকু বাধ্যতামূলক, ততটুকু কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
এরপর ভিওএ-র পূর্ণকালীন কর্মীদের প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক সাংবাদিকদের, যাঁরা কার্যত একই ধরনের কাজ করতেন, কোনও ক্ষতিপূরণ ছাড়াই একদিনে চাকরি হারাতে হয়।
হৃদরোগে আক্রান্ত গালপেরোভিচের নিয়মিত ওষুধের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল। ফলে তিনি দ্রুত নতুন কাজ খুঁজতে বাধ্য হন।
তিনি একা নন। ভিওএ-র শত শত চুক্তিভিত্তিক সাংবাদিক রাতারাতি অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন। অনেকেই সাংবাদিকতাকে আপাতত বিদায় জানিয়েছেন।
নাজি প্রচারের বিরুদ্ধে জন্ম, শীতল যুদ্ধের অস্ত্র
১৯৪২ সালে নাৎসি প্রচারের মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ভয়েস অব আমেরিকা। অধিকৃত ইউরোপে নিরপেক্ষ সংবাদ পৌঁছে দেওয়াই ছিল এর লক্ষ্য।
পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময় রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি-র সঙ্গে মিলিতভাবে এটি সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্বাধীন তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে ওঠে।
আজও বহু স্বৈরতান্ত্রিক দেশে ভিওএ স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয়বারও হারালেন নিজের সংবাদমাধ্যম
রাশিয়ার সাংবাদিক ক্সেনিয়া তুরকোভার কাছে এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়।
২০০০-এর দশকে তিনি মস্কোর স্বাধীন টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে কাজ করতেন। পরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্যাজপ্রম সেটি দখল করে। এরপর তিনি যে নতুন চ্যানেল গড়েছিলেন, সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি সংবাদমাধ্যমও একই পরিণতির শিকার হয়।
তাই ভিওএ ভেঙে পড়ার খবর শুনে তাঁর বহু পুরনো সহকর্মী রাশিয়া থেকে যোগাযোগ করেন। তাঁদের বিস্ময়—“এবারও একই ঘটনা! তাও আমেরিকায়?”
কর্মহীন হয়ে তিনি প্রথমে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের একটি ছোট কফিশপে বারিস্তা হিসেবে কাজ নেন।
“কফি সবসময়ই ভালোবাসতাম। ভেবেছিলাম, হয়তো এটা আমার জন্য এক ধরনের মানসিক চিকিৎসা হবে,” বলেন তিনি।
পরে দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে সেই কাজ ছেড়ে এখন তিনি ওয়াল্টার রিড সামরিক হাসপাতালে ইউক্রেনীয় ভাষার চিকিৎসা-দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে রুশ ভাষা শেখান এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতাও করেন।
তাঁর কথায়, “প্রথমে রাশিয়া আমাকে বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদ দিয়েছিল। পরে একই অনুভূতি পেলাম আমেরিকা থেকেও।”
আগেভাগেই সিদ্ধান্ত
জাতিসংঘে ভিওএ-র দীর্ঘদিনের সংবাদদাতা মার্গারেট বেসিয়ার অবশ্য পরিস্থিতির আগাম আভাস পেয়েছিলেন।
১৭ বছর জাতিসংঘ এবং তিন দশক আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছিলেন, দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম মেয়াদের মতো হবে না।
শপথ গ্রহণের দিনই যখন বৈদেশিক সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম সংকুচিত হতে শুরু করে, তখনই তাঁর মনে হয়েছিল, “যদি শিশুদের খাবার জোগানো সংস্থাকেও রেহাই না দেওয়া হয়, তাহলে ভিওএ-র ভবিষ্যৎও অন্ধকার।”
দু’দিনের মধ্যেই তিনি রিয়েল এস্টেটের প্রশিক্ষণে ভর্তি হন।
মার্চের শুরুতে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণের সুযোগ মিলতেই তিনি আবেদন করেন, যাতে ২৩ বছরের চাকরিজীবনের সুবিধাগুলি হারাতে না হয়।
এখন নিউইয়র্কে তিনি সফল রিয়েল এস্টেট এজেন্ট।
তাঁর মতে, “সাংবাদিকতা আর সম্পত্তি বিক্রির কাজের মধ্যে মিল আছে। দু’ক্ষেত্রেই মানুষের কথা শুনতে হয়, তথ্য খুঁজে বের করতে হয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।”
সবচেয়ে বেশি কী মিস করেন?
“সহকর্মীদের। প্রতিদিনের সেই বৈঠকগুলো। সাংবাদিকতা আমার কাছে চাকরি ছিল না, ছিল এক ধরনের আহ্বান।”
কফিশপে নতুন শুরু
ইন্দোনেশিয়ার সাংবাদিক ভালদিয়া বারাপুত্রির ১৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনও থেমে যায় এক রাতেই।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ ছিল তাঁর শেষ সরাসরি সম্প্রচার। পরদিন সকালে ট্রাম্পের নির্দেশ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় ভিওএ-র ইন্দোনেশীয় বিভাগ।
অল্প সময়ের জন্য তাঁকে আফগান পরিষেবায় পাঠানো হয়। তিনি দারি বা পশতু—কোনও ভাষাই জানতেন না, তবু সেই ভাষার সম্প্রচারের ভিডিও সম্পাদনা করতে হতো। জুলাইয়ে তাঁর চুক্তিও শেষ হয়ে যায়।
এখন তিনি ওয়াশিংটনের ইন্দোনেশীয় কফিশপ দুয়া ডিসি-তে যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তা।
সেখানে ইন্দোনেশিয়ার কফি চাষিদের গল্প তুলে ধরেন। কথা বলতে বলতে তাঁর চোখে জল এসে যায়।
“জানি, মানুষের পরিচয় শুধু তার পেশা নয়। কিন্তু সাংবাদিকতাই তো আমি ছিলাম।”
সাংবাদিকতার টান আজও রয়ে গেছে
গালপেরোভিচও এখনও সাংবাদিকতাকে বিদায় জানাননি।
তিনি বলেন, “এটাই পৃথিবীর সেরা পেশা। যদি কোনও দিন রুশ ভাষার সংবাদ সম্প্রচারের সুযোগ আবার তৈরি হয়, আমি মুহূর্তের মধ্যে ফিরে যাব।”
ততদিন পর্যন্ত ট্রেডার জো’জের মুদি দোকানই তাঁর কর্মক্ষেত্র।
সেখানে তিনি শুধু জীবিকা নয়, খুঁজে পেয়েছেন মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের সংযোগ, চিকিৎসার নিরাপত্তা এবং এমন এক কর্মপরিবেশ, যা তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতার আসল শক্তি ছিল মানুষের কাছাকাছি থাকা।