হাইলাইটস:

  • মুখ্যমন্ত্রীের ঘোষণা, সুপ্রিম কোর্টে কামদুনি নির্যাতিতা-হত্যা মামলায় পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না রাজ্য।
  • প্রয়োজনে সরকারি আইনজীবীর সহায়তাও দেওয়া হবে বলে আশ্বাস।
  • দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার নানা মোড় ঘুরে এখন মামলা সুপ্রিম কোর্টে।
  • নতুন অবস্থান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আইনি কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

বাংলাস্ফিয়ার: কামদুনি গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোড়ন তোলা অপরাধ। ২০১৩ সালের সেই নৃশংস ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল। তারপর কেটে গিয়েছে এক যুগেরও বেশি সময়। বিচার হয়েছে, উচ্চ আদালতের রায় হয়েছে, কিন্তু নির্যাতিতার পরিবারের দাবি ছিল— পূর্ণ ন্যায়বিচার এখনও অধরা। সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণা নতুন তাৎপর্য বহন করছে।

শনিবার মুখ্যমন্ত্রী জানান, সুপ্রিম কোর্টে নির্যাতিতার পরিবারের আবেদনের বিরুদ্ধে রাজ্য আর বিরোধিতা করবে না। বরং সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং প্রয়োজনে সরকারি আইনজীবীর সাহায্যও দেবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজ্যের স্ট্যান্ডিং কাউন্সেলকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে।

ঘোষণাটি আসে বারুইপুরের সাম্প্রতিক ধর্ষণ-হত্যা মামলার নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর। সেই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী কামদুনি মামলার উল্লেখ করেন এবং বলেন, অতীতে রাজ্যের অবস্থান যাই হয়ে থাকুক, বর্তমান সরকার চায় যাতে নির্যাতিতার পরিবার ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে প্রশাসনিক বাধার মুখে না পড়ে।

কামদুনি মামলার ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালের জুন মাসে। উত্তর ২৪ পরগনার কামদুনিতে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে এক তরুণীকে অপহরণ করে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরদিন উদ্ধার হয় তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ। ঘটনাটি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে বারাসত আদালত তিন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু পরে কলকাতা হাইকোর্ট সেই রায়ে পরিবর্তন আনে। দুই অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয় এবং একজনকে খালাস দেওয়া হয়। অন্য কয়েকজনের সাজাতেও পরিবর্তন আসে। এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে নির্যাতিতার পরিবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়।

পরিবারের অভিযোগ ছিল, তদন্তে একাধিক ত্রুটি ছিল এবং আদালতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। সেই কারণেই তারা সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিন রাজ্য কার্যত পরিবারের বিপরীত অবস্থানে ছিল, কিন্তু এখন সেই অবস্থান বদলানো হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, কলকাতা হাইকোর্টে মামলার শুনানির সময় একাধিকবার সরকারি কৌঁসুলি বদলানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের পরিবর্তন বিচারপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সুপ্রিম কোর্টে সরকার এমন কোনও অবস্থান নেবে না, যাতে নির্যাতিতার পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ফৌজদারি মামলায় রাজ্য সরকারের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তখন সরকারি আইনজীবীর যুক্তি ও নথি আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে সরকার যদি নির্যাতিতার পরিবারের বিরোধিতা না করার সিদ্ধান্ত নেয়, তা মামলার গতিপ্রকৃতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই আদালতের।

রাজনৈতিক দিক থেকেও এই ঘোষণার গুরুত্ব কম নয়। কামদুনি আন্দোলন একসময় রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। সেই ঘটনার স্মৃতি এখনও জনমানসে জীবন্ত। ফলে বর্তমান সরকারের এই অবস্থানকে অনেকেই নারীর নিরাপত্তা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

তবে ঘোষণার পরও মূল প্রশ্ন একই থেকে যাচ্ছে— সুপ্রিম কোর্টে বিচার কত দ্রুত এগোবে এবং নির্যাতিতার পরিবার যে পূর্ণ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছলেও, চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।

কামদুনি কেবল একটি অপরাধের নাম নয়; পশ্চিমবঙ্গে নারী-নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থার গতি এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের প্রতীক। সেই কারণেই রাজ্যের নতুন অবস্থানকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। এখন নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে— যেখানে নির্ধারিত হবে বহু বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।