মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এক রাতও কাটাননি—এমনই দাবি করেছেন লেখক মাইকেল উলফ। যদিও তাঁর এই দাবির কোনও স্বাধীন সূত্রে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

ট্রাম্পকে নিয়ে একাধিক বইয়ের লেখক উলফ বলেছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই মেলানিয়া নিজেকে অনেকটাই আড়ালে রেখেছেন।

‘দ্য ডেইলি বিস্ট’-এর একটি কথামালায় উলফ বলেন, ‘‘ফার্স্ট লেডি হিসেবে জনকল্যাণমূলক কাজ করাই তাঁর সরকারি দায়িত্বের প্রধান অংশ। কিন্তু সেই কাজকেই তিনি নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত করেছেন। এখন তাঁর অধিকাংশ সময় সেখানেই কাটে।’’

উলফের এই মন্তব্যের কয়েক দিন আগেই প্রায় এক মাসের ব্যবধানে হোয়াইট হাউসে প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে দেখা যায় মেলানিয়াকে। রোজ গার্ডেনে আয়োজিত ‘ফস্টারিং দ্য ফিউচার’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনি।

হোয়াইট হাউস থেকে ‘উধাও’ মেলানিয়া, দাবি উলফের

মেলানিয়ার সীমিত উপস্থিতিকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে বর্ণনা করেছেন উলফ। তাঁর কথায়, ‘‘ফার্স্ট লেডি নিজের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন, কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছেন। তিনি সত্যিই সেখানে নেই।’’

মেলানিয়ার অধীনস্থ ইস্ট উইংয়ের কর্মীর সংখ্যাও তাঁর সাম্প্রতিক পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক কম। প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেলানিয়ার দপ্তরে মাত্র পাঁচজন কর্মী রয়েছেন। অথচ সাম্প্রতিক কয়েকজন ফার্স্ট লেডির দপ্তরে প্রায় ২০ জন করে কর্মী ছিলেন।

প্রথাগত ফার্স্ট লেডির ভূমিকার বাইরে নিজের বাণিজ্যিক পরিচিতিও সম্প্রসারিত করেছেন মেলানিয়া। তিনি একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন। তাঁকে নিয়ে অ্যামাজন একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তথ্যচিত্রের জন্য অ্যামাজন প্রায় চার কোটি ডলার দিয়েছে।

নাটালি হার্পকে নিয়ে কী বলেছেন উলফ?

উলফের আরও দাবি, ট্রাম্পের সহযোগী নাটালি হার্প হোয়াইট হাউসে উপস্থিত থাকলে সেখানে থাকতে অস্বস্তি বোধ করেন মেলানিয়া।

উলফ বলেন, ‘‘মেলানিয়া কয়েকজনের কাছে জানিয়েছেন, নাটালি হার্প সেখানে থাকলে তিনি হোয়াইট হাউসে থাকতে চান না।’’ তবে এই দাবির সমর্থনে কোনও প্রমাণ দেননি তিনি।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর সহযোগী হোপ হিকসের সঙ্গে মেলানিয়ার সম্পর্কের প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন উলফ। তাঁর বক্তব্য, হার্প এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্যতম। মেলানিয়া যখন ট্রাম্পের পাশে থাকেন না, তখন প্রায়শই হার্পকে তাঁর পাশে দেখা যায়।

মেলানিয়ার সাম্প্রতিক হোয়াইট হাউস অনুষ্ঠানে অবশ্য হার্পকে দেখা যায়নি। ট্রাম্পের কাছে হার্পের অস্বাভাবিক রকম ঘনিষ্ঠ প্রবেশাধিকার নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, ঠিক সেই সময়েই প্রকাশ্যে এলেন মেলানিয়া।

প্রাক্তন ট্রাম্প-কর্মীর দাবি—মেলানিয়াকে দেখাই যেত না

হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন উপ-প্রেস সচিব সারা ম্যাথিউজও জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় মেলানিয়াকে প্রায় দেখাই যেত না। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার এবং পরে হোয়াইট হাউসে কাজ করলেও মেলানিয়ার সঙ্গে তাঁর কখনও সাক্ষাৎ হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।

‘অন সানডে উইথ জ্যাক ককিয়ারেলা’ কথামালায় ম্যাথিউজ বলেন, ‘‘একমাত্র মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গেই আমার কখনও দেখা হয়নি।’’

তাঁর দাবি, প্রশাসনের ভিতরে এটি সকলেরই জানা ছিল যে মেলানিয়া ‘‘সেখানে থাকতেন না এবং থাকতেও চাইতেন না’’।

ম্যাথিউজ আরও বলেন, হোয়াইট হাউসের পরিবর্তে নিউইয়র্কে থাকাই পছন্দ করতেন মেলানিয়া। হার্পকে ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে ওঠার সময়েই মেলানিয়ার সাম্প্রতিক প্রকাশ্য উপস্থিতির নেপথ্য উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে ম্যাথিউজ স্বীকার করেছেন, পালক শিশুদের কল্যাণ মেলানিয়ার অন্যতম আগ্রহের বিষয়।

হোয়াইট হাউসে ১৪ দিনেরও কম ছিলেন মেলানিয়া?

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের গোড়া থেকেই মেলানিয়ার সীমিত উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ‘পিপল’-এ উদ্ধৃত ২০২৫ সালের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম কয়েক মাসে মেলানিয়া হোয়াইট হাউসে ১৪ দিনেরও কম সময় কাটিয়েছিলেন। কোনও কোনও সূত্রের দাবি, এই হিসাবও উদারভাবে করা হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ ও ফার্স্ট লেডি-বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন জেলিসন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, মেলানিয়া অস্বাভাবিক রকম আড়ালে রয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বেস ট্রুম্যানের পর এত কম জনসমক্ষে আসা কোনও ফার্স্ট লেডিকে আমরা দেখিনি।’’

ওই সময়ে হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন মেলানিয়া। মার্চে মার্কিন কংগ্রেসের একটি আলোচনাসভায় তিনি আন্তর্জালীয় হেনস্থা ও প্রতিশোধমূলক অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। এপ্রিলে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ’ সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং হোয়াইট হাউসের ইস্টার এগ রোলেও উপস্থিত ছিলেন।

২৬ এপ্রিল পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে যোগ দিতে ট্রাম্পের সঙ্গে রোমেও গিয়েছিলেন মেলানিয়া। ঘটনাচক্রে সেদিনই ছিল তাঁর ৫৫তম জন্মদিন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগেই মেলানিয়া জানিয়েছিলেন, তিনি হোয়াইট হাউস, নিউইয়র্ক এবং ফ্লরিডায় দম্পতির মার-আ-লাগো বাসভবনের মধ্যে সময় ভাগ করে নেবেন।

১৩ জানুয়ারি ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি হোয়াইট হাউসে থাকব। যখন নিউইয়র্কে থাকার প্রয়োজন হবে, তখন নিউইয়র্কে থাকব। আবার যখন পাম বিচে থাকা প্রয়োজন হবে, তখন পাম বিচে থাকব। আমার প্রথম অগ্রাধিকার—একজন মা, একজন ফার্স্ট লেডি এবং একজন স্ত্রী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করা।’’

দ্বিতীয় মেয়াদে মেলানিয়ার প্রকাশ্য উপস্থিতি

‘ডেইলি বিস্ট’-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মেলানিয়াকে গড়ে প্রতি ছ’দিনে একবার কোনও প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে। তবে গ্রীষ্মকালে সেই উপস্থিতির হার আরও কমে যায়।

তবে মেলানিয়ার হোয়াইট হাউসে অনুপস্থিতির প্রধান কারণ নাটালি হার্প—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। আপাতত বিষয়টি মূলত মাইকেল উলফের অভিযোগ এবং কয়েকজন প্রাক্তন ট্রাম্প-কর্মীর পর্যবেক্ষণের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে।