বেসরকারিকরণ হবে না, বাড়াতে হবে মহাকাশ অর্থনীতি: কর্মীদের আশ্বাস ইসরো প্রধানের

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর বেসরকারিকরণ হচ্ছে না।
- তবে দেশের মহাকাশ অর্থনীতিকে বড় করতে বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
- সংস্থার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে কর্মীদের উদ্বেগের মধ্যে এই বার্তা দিলেন ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর বেসরকারিকরণ হচ্ছে না। তবে দেশের মহাকাশ অর্থনীতিকে বড় করতে বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। সংস্থার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে কর্মীদের উদ্বেগের মধ্যে এই বার্তা দিলেন ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন। তাঁর বক্তব্য, বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে সাহায্য করা এবং ইসরোর গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা—দুই লক্ষ্য একসঙ্গেই পূরণ করা সম্ভব। দেশের ক্রমবর্ধমান মহাকাশ কর্মসূচির প্রয়োজনেই উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়াতে হবে।
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে মহাকাশ প্রদর্শনীর ফাঁকে নারায়ণন জানান, সহকর্মীদের যথার্থ উদ্বেগের ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। তবে প্রায় ২০ হাজার কর্মীর সংস্থায় কোনও চিঠি পাওয়ামাত্র লিখিত জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। মহাকাশ ক্ষেত্রে সংস্কার শুরু হওয়ার পর থেকেই চেয়ারম্যান-সহ নেতৃত্ব তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে। কর্মীদের প্রশ্নগুলিও সেই প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
বিতর্কের সূত্রপাত মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের প্রসার ও অনুমোদনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ইন-স্পেসের চেয়ারম্যান পবন গোয়েঙ্কার মন্তব্য থেকে। গত ২১ আগস্ট তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে উৎক্ষেপণযান তৈরির দায়িত্ব বেসরকারি শিল্প অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নিতে পারে। ইসরোর উৎপাদন ও পরিচালনাগত দায়িত্ব অন্য সংস্থায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তখন থেকেই কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।
গত ৪ সেপ্টেম্বর ইসরোর নয়টি কর্মী সংগঠন নারায়ণনকে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চায়। তাদের প্রশ্ন ছিল, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের অনুমোদিত নীতি কী, তার প্রশাসনিক ভিত্তি কোথায় এবং কোন পর্যায়ে তা কার্যকর হবে। বর্তমান কর্মীদের ভবিষ্যৎ ও সরকারি নিয়োগের উপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। সংগঠনগুলির বক্তব্য, ইসরোর তৈরি প্রযুক্তি জাতীয় সম্পদ; তার হস্তান্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
এই উদ্বেগের পটভূমিতে রবিবার বিস্তারিত বিবৃতি দেয় ইসরো। সেখানে সংস্থার বেসরকারিকরণ কিংবা গুরুত্ব কমানোর জল্পনা খারিজ করা হয়। জানানো হয়, উন্নত মহাকাশ গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, জাতীয় ও কৌশলগত অভিযান এবং মহাকাশ অনুসন্ধানে ভারতের প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ চালাবে ইসরো। শিল্পের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্য, প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের আরও জটিল গবেষণায় মনোনিবেশের সুযোগ দেওয়া।
ইসরোর হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির বর্তমান আয়তন প্রায় ৮৪০ কোটি ডলার। ২০৩৩ সালের মধ্যে তা ৪,৪০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। সংস্থার যুক্তি, শুধু সরকারি অর্থ এবং ইসরোর জনবল দিয়ে এই সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন বেসরকারি পুঁজি, শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা, নতুন উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
নারায়ণন মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে শিল্পের অংশগ্রহণ নতুন নয়। এলভিএম৩ বা জিএসএলভি উৎক্ষেপণের সমস্ত কাজ ইসরো একা করে—এমন ধারণা ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই ভারতীয় শিল্পের মাধ্যমে ব্যয় হয় এবং প্রায় ৪৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংস্থার জন্য কাজ করছে। ফলে আগামী দিনের বাড়তি প্রয়োজন মেটাতে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতেই হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের মানুষের পরিষেবায় ৫৬টি মহাকাশ সম্পদ ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনেক বেশি। চন্দ্রযান-৪, চন্দ্রযান-৫, শুক্র অভিযান, ভারতীয় মহাকাশ স্টেশন এবং নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণযানের মতো কর্মসূচি ইসরোর দায়িত্ব বাড়াচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা করার পাশাপাশি এই সমস্ত বৃহৎ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও সংস্থাকেই পালন করতে হবে।
উৎপাদনের দায়িত্ব ভাগাভাগির পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড এবং লারসেন অ্যান্ড টুবরোর নেতৃত্বাধীন শিল্পজোট পিএসএলভি তৈরি করছে। ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণযান এসএসএলভির প্রযুক্তিও হ্যালের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলির মধ্য দিয়েই গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তিকে বৃহত্তর শিল্পোৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করার নীতি বাস্তব রূপ পাচ্ছে। কর্মীদের উদ্বেগও মূলত এই দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পরিণতি ঘিরেই।
ইসরোর ব্যাখ্যায়, আগামী দিনে তার বিশেষ গুরুত্ব থাকবে মানববাহী মহাকাশযাত্রা, উন্নত গবেষণা, নতুন উৎক্ষেপণব্যবস্থা, দূর মহাকাশ এবং গ্রহ অভিযানে। যোগাযোগ, দিকনির্ণয় ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি, সংবেদক এবং চালনব্যবস্থার প্রযুক্তিও তৈরি করবে সংস্থা। অন্যদিকে, নিয়মিত ব্যবহৃত উপগ্রহ ও প্রতিষ্ঠিত উৎক্ষেপণযানের উৎপাদন উপযুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় শিল্প বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মাধ্যমে বাড়ানো যেতে পারে।
এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও। ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতীয় মহাকাশ স্টেশন স্থাপন এবং ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে ভারতীয় মহাকাশচারী পাঠানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ইসরোর বক্তব্য, এমন অভিযানের জন্য বিশেষ গবেষণাগত দক্ষতা প্রয়োজন। বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড দিয়ে সেই সক্ষমতার বিকল্প তৈরি করা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাকাশ পরিকাঠামো ও কৌশলগত সক্ষমতার মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে।
তবে প্রকাশিত ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যাচ্ছে, সংস্থার সরকারি মালিকানা বজায় থাকা এবং তার দৈনন্দিন কাজের বিন্যাস অপরিবর্তিত থাকা এক বিষয় নয়। কর্মীরা সেই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখাই জানতে চেয়েছেন। কোন কাজ শিল্পের হাতে যাবে, কীভাবে যাবে এবং কর্মী ও নিয়োগের ক্ষেত্রে তার ফল কী হবে—এই প্রশ্নগুলির বিস্তারিত উত্তর এখনও তাঁদের প্রত্যাশিত। নারায়ণনের আশ্বাসের পর তাই কর্মীদের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনাতেই নজর থাকবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



