International

কয়লায় টান!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কয়লার মজুত নিয়ে উদ্বেগ।
  • দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেই জ্বালানির ভাণ্ডার নেমেছে সংকটজনক স্তরে।
  • কেন্দ্রের দাবি, কয়লার অভাব নেই; চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কয়লার মজুত নিয়ে উদ্বেগ। দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেই জ্বালানির ভাণ্ডার নেমেছে সংকটজনক স্তরে। কেন্দ্রের দাবি, কয়লার অভাব নেই; চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির মজুতের পরিসংখ্যানও বলছে, উৎপাদন চালু রাখতে জ্বালানির জোগান ও ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

দ্য হিন্দুর ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনের প্রকাশিত সারাংশ অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ)-র ৩০ সেপ্টেম্বরের হিসাব বলছে, দেশের ১৯১টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৪টিতে কয়লার মজুত উদ্বেগজনক স্তরে। অর্থাৎ, প্রায় প্রতি ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতেই জ্বালানির ভাণ্ডার নিয়ে সতর্ক হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ ২৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনিমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি দেশে কয়লার ঘাটতির কথা অস্বীকার করে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদাকেই সমস্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

সিইএ-র নির্ধারিত প্রয়োজনীয় মজুতের ২৫ শতাংশের নীচে কয়লা থাকলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রকে সংকটজনক তালিকায় রাখা হয়। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ওই কেন্দ্রগুলি ইতিমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বরং নিয়মিত সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই দেশে মোট কত কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রে কতটা কয়লা মজুত রয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চাহিদার চাপে কয়লার ভাণ্ডার

দ্য হিন্দুর প্রকাশিত সারাংশে চলতি বছরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২১ মে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎচাহিদা পৌঁছেছিল ২৭০.৮ গিগাওয়াটে। চাহিদার এই ঊর্ধ্বগতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করার প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

মজুত কমার ছবিটি আরও স্পষ্ট সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশীয় কয়লার উপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে মাসের শুরুতে মজুত ছিল ২ কোটি ৫৪ লক্ষ টন। ২৭ সেপ্টেম্বর তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯২ লক্ষ টনে। অর্থাৎ, এক মাসেরও কম সময়ে মজুত কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। ওই দিনের হিসাবে প্রয়োজনীয় মজুত ছিল ৫ কোটি ৩৭ লক্ষ টন। সেই তুলনায় বাস্তব মজুতের ঘাটতি ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ।

এর পিছনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসগুলির মধ্যে পরিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে। একই সংবাদসূত্রের হিসাবে, ১ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫.৫ শতাংশ বেড়েছিল। অন্য দিকে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছিল ১৫.৫ শতাংশ। জলবিদ্যুতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়েছে। তার ফলে কয়লার ব্যবহারও বেড়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে বর্ষার প্রভাব। বৃষ্টির কারণে কয়লা খনন এবং খনি থেকে কয়লা সরানোর কাজে বিঘ্ন ঘটলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি পৌঁছতে দেরি হতে পারে। চাহিদা যখন বেশি, তখন এই ধরনের পরিবহণগত সমস্যা মজুতের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

বাড়তি উৎপাদনের নির্দেশ

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ১১২টি শিল্পসংস্থার নিজস্ব কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র, বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলি মূলত সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিদ্যুতের চাহিদা মেটায়। সেগুলির উৎপাদন বাড়িয়ে সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহে স্বস্তি আনার চেষ্টা হচ্ছে।

অন্য দিকে, কয়লা মন্ত্রকের ৫ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে সরবরাহ বৃদ্ধির হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রকের দাবি, সেপ্টেম্বরে বিদ্যুৎক্ষেত্রে কোল ইন্ডিয়ার কয়লা সরবরাহ হয়েছে ৪ কোটি ৮৯ লক্ষ টন, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০.৬৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসে এই সরবরাহ বেড়েছে ৬.১ শতাংশ। সরকারের বক্তব্য, পরিবহণের উন্নতি এবং উৎপাদনের সঙ্গে সরবরাহের সমন্বয় বাড়ানোর ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

তবে একই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসে খনির কাছে আগে থেকে জমিয়ে রাখা মজুত থেকে ৬ কোটি ৩০ লক্ষ টন কয়লা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, সরবরাহ বাড়লেও তার একটি অংশ এসেছে পুরনো সঞ্চয় থেকে। পাশাপাশি, একই সময়ে দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯.৯ শতাংশ। ফলে সরবরাহ বৃদ্ধির হার ইতিবাচক হলেও, চাহিদা ও ব্যবহারের গতি মাথায় রেখে মজুতের পরিস্থিতি বিচার করা জরুরি।

কয়লা দ্রুত বোঝাই ও পরিবহণের পরিকাঠামো উন্নত করতেও পদক্ষেপ করছে মন্ত্রক। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৪৬টি কয়লা বোঝাই পরিকাঠামোর মাধ্যমে বছরে ৪৩ কোটি ২০ লক্ষ টন কয়লা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরানোর ক্ষমতা রয়েছে। খনি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত জ্বালানি পৌঁছনোর সময় কমানো এবং সরবরাহ নিয়মিত রাখাই এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। তবে পরিকাঠামোর সক্ষমতা বাড়লেই যে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনমতো কয়লা সময়মতো পৌঁছবে, তা নিশ্চিত নয়।

বিকল্প জোগানের ভাবনা

দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুতের চাহিদা সামলাতে কয়লার উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন সব সময়ে সমান থাকে না। ফলে দিনের যে সময়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বেশি, সেই সময়ে বাড়তি বিদ্যুৎ জমিয়ে রেখে সন্ধ্যা বা রাতের চাহিদার সময় কাজে লাগানো গেলে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।

এই লক্ষ্যেই ব্যাটারি এবং পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পে জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক। পাম্পড স্টোরেজ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকার সময়ে জল উঁচুতে তুলে রাখা হয়। পরে প্রয়োজনের সময়ে সেই জল নীচে নামিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি সঞ্চয়ক্ষমতা গড়ে তুলতে দুটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, ২০২৯–৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সঞ্চয়ক্ষমতার প্রয়োজন হতে পারে বলে অনুমান করেছে সিইএ। গিগাওয়াট-ঘণ্টা দিয়ে বোঝানো হয়, কতটা বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব। তবে প্রস্তাবিত বা পরিকল্পনাধীন ক্ষমতা আর বাস্তবে চালু থাকা সঞ্চয়ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

সরবরাহ বাড়লেই কি স্বস্তি?

বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, কয়লা সরবরাহের সাফল্য শুধু আগের বছরের তুলনায় কত শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কত দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে, দৈনিক কতটা কয়লা পৌঁছচ্ছে এবং কতটা ব্যবহার হচ্ছে। জাতীয় স্তরে সরবরাহের পরিসংখ্যান ইতিবাচক হলেও কোনও কোনও কেন্দ্রে মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

শীতের দিকে তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদার উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার উপর নির্ভর করে মজুত পুনর্গঠনের কাজ পিছিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। আপাতত সবচেয়ে জরুরি হল, সংকটজনক মজুত থাকা কেন্দ্রগুলিতে নিয়মিত কয়লা পৌঁছে দেওয়া এবং চাহিদা, উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা।

শেষ পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, তার পরীক্ষা শুধু উৎপাদনের মোট পরিমাণে নয়। চাহিদা যখন সর্বোচ্চ, ঠিক তখনও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে কি না, সেটাই হবে আসল মাপকাঠি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles