Home খবর ধর্মেন্দ্র ইস্তফা দেননি, আমরা আদায় করেছি

ধর্মেন্দ্র ইস্তফা দেননি, আমরা আদায় করেছি

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
18 views 4 minutes read
A+A-
Reset

নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে শনিবারের বিকেলটা যেন মুহূর্তের মধ্যে ইতিহাসে পরিণত হল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে পুলিশের মাইক থেকে বারবার ঘোষণা ভেসে আসছিল—ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন পাথর ছুড়ছে, শান্তি বজায় রাখুন—সেই একই জায়গা কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিণত হল বিজয়োৎসবের মঞ্চে।

জয় সিং মার্গ ও টলস্টয় রোডের মোড়ে তখনও ধোঁয়া ভাসছে। আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবকেরা ছুটে বেড়িয়ে বিক্ষোভকারীদের পিছিয়ে যেতে বলছেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অশুতোষ রাঙ্কা পুলিশের ঘোষণার গাড়িতে উঠে সবাইকে শান্ত থাকার আবেদন করছেন।

ঠিক তখনই, দুপুর প্রায় ২টা ২০ মিনিট নাগাদ, জনতার মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আরেকটি খবর—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।

প্রথমে অনেকে বিশ্বাসই করতে পারেননি। আন্দোলনস্থলের আশপাশে ইন্টারনেট জ্যামার চালু থাকায় কারও ফোনে খবর যাচাই করার সুযোগ ছিল না। সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠলেন। আরেকজন সেই চিৎকারে সাড়া দিলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গোটা যন্তর-মন্তর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল উল্লাস।

জলের বোতল থেকে একে অপরের গায়ে জল ছিটিয়ে উৎসব শুরু হয়। কেউ বন্ধুর কাঁধে উঠে নাচতে লাগলেন, কোথাও আবার লাউডস্পিকারে বাজতে শুরু করল গান।

একজন সাংবাদিক মাইক্রোফোনে ঘোষণা করছিলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দিয়েছেন।” সঙ্গে সঙ্গে জনতার ভিড় থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠ ভেসে এল—“ইস্তফা আমরা নিয়েছি, উনি দেননি।”

একটি মাত্র বাক্য মুহূর্তের মধ্যে আন্দোলনের নতুন স্লোগানে পরিণত হয়। একদল থেকে আরেকদলে, এক মুখ থেকে অন্য মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সেই উচ্চারণ।

মূল মঞ্চের কাছে অভিনেতা সুধীর সাংওয়ান মজা করে ঘোষণা করেন, খুব শিগগিরই ‘মেলোডি’ মিষ্টি বিলি করা হবে। তারপর পুলিশের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ইন্টারনেট জ্যামার তুলে নেওয়া হোক, যাতে সবাই জাতীয় পতাকা হাতে নিজেদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে কিছুক্ষণ হাঁটু গেড়ে বসে থাকার পর উঠে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে বলেন, “আমরা পেরেছি। সত্যিই আমরা পেরেছি।”

গুরগাঁওয়ের গৃহবধূ মল্লিকা, যিনি তাঁর ১১ বছরের ছেলেকে নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, বলেন, “সরকারের এত দেরি করা লজ্জাজনক। কিন্তু এই প্রজন্ম হাল ছাড়েনি। ওদের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।”

জনপথ মোড়ে প্রথমবার আন্দোলনে আসা উদ্যোক্তা নেহা ও লেডি শ্রীরাম কলেজের স্নাতক মণীষা চারপাশের দৃশ্য দেখে বিস্মিত। নেহার কথায়, “এরা এমন একটা কাজ করে দেখাল, যা আগে কেউ পারেনি।” মণীষা হাসতে হাসতে বন্ধুকে বললেন, “তুই আজই এলে, আর আজই উনি ইস্তফা দিলেন।”

নিজের নাম শুধু ‘অমন’ বলে পরিচয় দেওয়া এক ১৮ বছরের ছাত্রের বক্তব্য, “এটাই শেষ নয়, শুরু। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে অন্য দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রীদেরও একইভাবে পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে।”

দেহরাদুন থেকে আসা এক অভিভাবক বলেন, তিনি নিজের সন্তানের পাশাপাশি আন্দোলনরত সব ছাত্রছাত্রীকে সমর্থন জানাতেই এসেছেন। তাঁর কথায়, “ছাত্রছাত্রীরা যাতে আবার নিশ্চিন্তে পড়াশোনায় ফিরতে পারে, তার জন্য ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ অত্যন্ত জরুরি ছিল।”

চারদিকে তখন নাচ, গান, স্লোগানের ঢেউ। ‘জয় ভীম’ থেকে ‘ভারত মাতা কি জয়’—বিভিন্ন স্লোগানে মুখর আন্দোলনস্থল। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ প্রতিবাদী গান গাইছেন, আবার একদল দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইছেন।

সন্ধ্যার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব ঘোষণা করে যে সরকার তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে এবং কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তবু অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যাননি।

এবার পুলিশের ঘোষণার গাড়ি থেকে অন্য বার্তা শোনা গেল—“মেট্রো চালু হয়েছে। আপনারা বাড়ি ফিরে যান। আপনাদের দাবি পূরণ হয়েছে।”

জনপথ মেট্রো স্টেশনের বাইরে স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি ফেরা মানুষদের হাতে জল ও পিৎজার টুকরো তুলে দিচ্ছিলেন। কেউ কার্ডবোর্ড দিয়ে বাতাস করছিলেন ক্লান্ত বিক্ষোভকারীদের। অনেকেই মেট্রোর দিকে হাঁটতে হাঁটতেও ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনি তুলছিলেন।

ধীরে ধীরে জনতা সরে গেলেও কিছু স্বেচ্ছাসেবক থেকে যান। তাঁরা আন্দোলনস্থলে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করতে শুরু করেন।

২৬ বছরের স্বেচ্ছাসেবক তুষার মেহরা, যিনি আন্দোলনের পনেরোতম দিন থেকে সেখানে কাজ করছিলেন, বলেন, “এই জায়গাটা আমরা ব্যবহার করেছি। তাই এটাকে পরিষ্কার করাও আমাদের দায়িত্ব।”

উৎসবের আবহে তাঁর এই কথাই যেন আন্দোলনের শেষ বার্তা হয়ে রইল—দায়িত্ব শুধু প্রতিবাদে নয়, তার পরেও।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles