ইয়েমেনে ফের আগুন

যা জানা জরুরি
- অ্যাডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে এসে পড়ল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
- কায়রো থেকে আসা যাত্রীবাহী বিমান তখন অবতরণের অপেক্ষায়।
- কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিমান ঘুরিয়ে পাঠানো হল জেড্ডায়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অ্যাডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে এসে পড়ল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। কায়রো থেকে আসা যাত্রীবাহী বিমান তখন অবতরণের অপেক্ষায়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিমান ঘুরিয়ে পাঠানো হল জেড্ডায়। একই সময়ে সৌদি আরবের রিয়াধ ও আবহা বিমানবন্দরেও হামলার খবর। সব মিলিয়ে ফের উত্তপ্ত ইয়েমেন যুদ্ধ।
বুধবার, ৭ অক্টোবর ভোরে অ্যাডেন বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের পরিবহণ মন্ত্রক। মন্ত্রকের দাবি, কায়রো থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বিমান অবতরণের কয়েক মিনিট আগে বিমানবন্দরের রানওয়ের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রটি এসে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিমানটিকে জেড্ডায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। আরও হামলার আশঙ্কায় বিমানবন্দরে থাকা দুটি বিমানও সরিয়ে নেওয়া হয়।
হুথিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অংশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র অ্যাডেন বিমানবন্দর। ফলে সেখানে হামলা শুধু বিমান চলাচলকেই বিপন্ন করেনি, সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রাথমিক হিসাবে অ্যাডেনে হতাহতের খবর নেই। তবে বিমানবন্দরের কাছের একটি সামরিক শিবিরে আঘাত হানার দাবি করেছে হুথিরা।
এর মধ্যেই সৌদি আরব থেকেও এসেছে পাল্টা হামলার খবর। হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে একাধিক ড্রোন পাঠানো হয়েছে। আবহা বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে সংগঠনটি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট অবশ্য জানিয়েছে, রিয়াধের উত্তরে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। অর্থাৎ খামিস মুশাইত ও রিয়াধের ঘটনাকে একই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পরে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াধ ও আবহা বিমানবন্দরে হামলায় মোট তিন জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। রিয়াধে একজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। আবহায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন, আহত হয়েছেন আরও ২৮ জন।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার পিছনে রয়েছে ইয়েমেনের যুদ্ধের নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা। লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সৌদি বিমানবাহিনীর সহায়তায় ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারের অভিযান চালাচ্ছে। সেই অভিযানে মোকা বন্দর এবং বাব আল মান্দেব-সংলগ্ন অঞ্চল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বাব আল মান্দেব কোনও সাধারণ জলপথ নয়। এই সরু প্রণালি দিয়েই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলাচল করে। ফলে ইয়েমেনের মাটিতে সংঘাত যত বাড়ে, তার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও।
বর্তমান সংকটের শিকড় অবশ্য আরও পুরনো। ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতায় ফেরাতে ২০১৫ সালে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। বছরের পর বছর যুদ্ধের পর ২০২২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কিছুটা স্বস্তি এনেছিল।
সেই সময় সহিংসতা ও অসামরিক মানুষের প্রাণহানি কমে। জ্বালানি সরবরাহ বাড়ে, আর সানা থেকে ফের শুরু হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচল। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে বিমান যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়া তাই ছিল শান্তির অন্যতম দৃশ্যমান সুফল।
কিন্তু নতুন করে সংঘর্ষ বাড়ায় সেই স্বস্তিও এখন অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও জরুরি সহায়তার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে। সংস্থার প্রধান অ্যামি পোপ আরও অর্থসাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।
ফলে অ্যাডেনের রানওয়ের পাশে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার ঘটনা নিছক একটি সামরিক হামলা নয়। একটি বিমান কয়েক মিনিটের জন্য এদিক-ওদিক ঘুরে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে যুদ্ধের বড় বাস্তবতা—আকাশপথ, সমুদ্রপথ, বন্দর কিংবা বিমানবন্দর, কোনওটাই আর পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আর যুদ্ধের প্রতিটি নতুন বিস্ফোরণের শেষ মূল্যটা দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



