বিশ্বকাপে গোলের সোনালি যুগ: মেসি-রোনালদোদের দেখে আমরা ইতিহাসের সাক্ষী

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফঁতেনের ১৩ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড এবার ভাঙতে পারে বলে বিশ্বাস।
- আধুনিক ফুটবলারদের ফিটনেস ও জীবনযাপন তাঁদের চল্লিশের পরও সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে সাহায্য করছে।
- মেসি শুধু গোলদাতা নন, অসাধারণ সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় ও নেতা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস
- ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফঁতেনের ১৩ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড এবার ভাঙতে পারে বলে বিশ্বাস।
- আধুনিক ফুটবলারদের ফিটনেস ও জীবনযাপন তাঁদের চল্লিশের পরও সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে সাহায্য করছে।
- মেসি শুধু গোলদাতা নন, অসাধারণ সৃষ্টিশীল খেলোয়াড় ও নেতা।
- রোনালদো এখনও দুর্দান্ত গোলশিকারি; আকাশপথেও ভয়ঙ্কর।
- মেসি-রোনালদো বিতর্ক নয়, তাঁদের যুগকে উদযাপন করাই উচিত।
- বিশ্বকাপে বেশি সময় বল খেলায় থাকায় গোলও বেড়েছে।
আমি অবাক হব যদি ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে জাস্ট ফঁতেনের করা ১৩ গোলের রেকর্ড এবার ভেঙে না যায়। কারণ, বর্তমান সময়ের সেরা স্ট্রাইকারদের মান এতটাই অসাধারণ যে তারা একে অপরকে আরও বেশি গোল করার জন্য প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আমরা সত্যিই সৌভাগ্যবান যে একই সময়ে এই প্রজন্মের এত বড় বড় গোলদাতাকে খেলতে দেখতে পাচ্ছি।
আমার আরও বিশ্বাস, আধুনিক ফুটবলে বিশ্বমানের গোলদাতা হওয়ার জন্য যে দক্ষতা দরকার, তার কারণে ভবিষ্যতে আরও বেশি খেলোয়াড় চল্লিশ পেরিয়েও খেলতে পারবেন। এমনকি লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেও হয়তো আরেকটি বিশ্বকাপে দেখা যেতে পারে।
বিশ্বমানের স্ট্রাইকার হতে শুধু গতি নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক অবস্থান নেওয়া। দরকার প্রবল সহজাত অনুভূতি, নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং বল কোথায় আসবে তা আগেভাগে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা। এই গুণগুলো শরীরের চেয়ে অনেক বেশি মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা থেকে তারা ভিড়ের মধ্যে সুযোগ তৈরি করতে শিখেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, তারা নিজেদের শরীরের অসাধারণ যত্ন নিচ্ছে। মেসির বয়স ৩৯, রোনালদোর ৪১। বিশ্বকাপে না খেললেও ৩৭ বছর বয়সী রবার্ট লেভানডোভস্কিও এখনও দুর্দান্ত খেলছেন। ৩২ বছরের হ্যারি কেনও সম্পূর্ণ পেশাদারের মতো নিজের শরীরের যত্ন নেন। একই অভ্যাস দেখা যায় আর্লিং হালান্ডের মতো নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যেও। তারা নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খায়, উন্নত পুনর্বাসন পদ্ধতি অনুসরণ করে, জিমে কঠোর অনুশীলন করে এবং মদ্যপানের মতো অভ্যাস থেকে দূরে থাকে।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি মার্তা ৪০ বছর বয়সেও গুরুত্বপূর্ণ গোল করছেন। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। আগের প্রজন্মের ফুটবলারদের জীবনযাত্রার সঙ্গে তুলনা করে আমরা অনেক সময় প্রবীণ খেলোয়াড়দের খুব তাড়াতাড়ি শেষ বলে ধরে নিই। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়রা বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলন ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক বেশি সময় সেরা পর্যায়ে থাকতে পারছেন। দিয়েগো মারাদোনার জীবনযাত্রার সঙ্গে আজকের তারকাদের অভ্যাসের পার্থক্যই তার বড় প্রমাণ।
এই প্রজন্মের স্ট্রাইকারদের খেলার ধরনও ভিন্ন। মেসিকে যখন প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে বল ছাড়া খেলতে দেখবেন, তখন বুঝবেন তিনি সব সময় মাঠের মাঝের অংশে, ছয় গজ বক্সের প্রস্থজুড়ে ঘোরাফেরা করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং তা বাস্তবায়নের দক্ষতাই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে।
মেসি শুধু গোল করেন না, তিনি খেলাও তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে এক অসাধারণ সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়ে পরিণত করেছেন। এখনও তিনি প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যেতে পারেন, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রতিপক্ষকে নিজের দিকে টেনে এনে ফাঁকা জায়গায় থাকা সতীর্থকে বল পৌঁছে দেওয়া।
একটি মুহূর্তে জাদু তৈরি করার ক্ষমতাই আর্জেন্টিনাকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল বানিয়েছে। জর্ডানের বিপক্ষে তাঁর ফ্রি-কিকটি ছিল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সবাই দেখছিলেন তিনি গোলরক্ষককে একদিকে তাকাতে বাধ্য করছেন, অথচ বল পাঠালেন অন্য জায়গায়। তিনি সব সময় অন্যদের চেয়ে এক ধাপ আগে ভাবেন।
রোনালদো তুলনামূলকভাবে খাঁটি নম্বর নয়। তিনি শক্তিশালী ফিনিশার এবং হেডে ভীষণ বিপজ্জনক। আমি সবসময়ই রোনালদোর বড় ভক্ত ছিলাম। তবে গত চার বছরে মেসির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়েছে। কারণ, তিনি যেভাবে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। তিনি নেতা, গোল করেন, আবার সমান দক্ষতায় গোলও তৈরি করে দেন।
মেসি না রোনালদো—এই বিতর্ক নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমার কাছে এটি অর্থহীন। বরং বলা উচিত, আমরা দীর্ঘ সময় ধরে দুইজন অসাধারণ ফুটবলারের যুগ দেখার সৌভাগ্য পেয়েছি। তাঁদের তুলনা করে একজনকে ছোট করা ঠিক নয়। ভবিষ্যতে কি আমরা হালান্ড, কিলিয়ান এমবাপে বা লামিন ইয়ামালকেও একইভাবে তুলনা করব? না। বরং তাঁদের নিজস্ব গুণের জন্যই উপভোগ করা উচিত।
অনেকে বলেন ইউরোপ ছেড়ে অন্য লিগে গেলে মান কমে যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারও শক্তিশালী প্রতিযোগিতা। সেখানে ২০২৫ মৌসুমে ২৮ ম্যাচে ২৯ গোল করেছেন মেসি। এই পরিসংখ্যান নিজেই তাঁর অসাধারণত্বের প্রমাণ।
আমি আমার ছেলে হ্যারিকে নিয়ে ডেনভারে ৬৫ হাজার দর্শকের সামনে মেসির খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন মেসি বাঁকানো শটে বল জালে জড়াতেই আমার ছেলে বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। তখনই মনে হয়েছিল, এই স্মৃতি সে সারা জীবন মনে রাখবে।
সে মেসিকে নিয়ে বই পড়ে, ভিডিও গেমে মেসি সেজে খেলে। তাই নিজের চোখে মেসিকে দেখা তার জীবনের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। যেমন আমার বাবা আমাকে বিশ্বকাপের প্রেমে পড়তে শিখিয়েছিলেন, আমিও চাই আমার ছেলের মধ্যেও সেই ভালোবাসা জন্ম নিক। এই বিশ্বকাপ সেই আবেগ আরও ছড়িয়ে দিয়েছে।
আমি আগেই বলেছিলাম, এবারের বিশ্বকাপে গোলের নতুন রেকর্ড হতে পারে। দল বেড়েছে, ম্যাচ বেড়েছে, আবার সেরা খেলোয়াড়রাও নিজেদের সেরাটা দিচ্ছেন। দর্শকদের অসাধারণ সমর্থন, দ্রুত ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্ত, পঞ্চাশ-পঞ্চাশ বলের লড়াইয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং সময় নষ্ট কমানোর কঠোরতা—সব মিলিয়ে বল এখন অনেক বেশি সময় খেলায় থাকছে।
আর যখন বিশ্বের সর্বকালের সেরা কয়েকজন গোলদাতা সেই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগাচ্ছেন, তখন ফুটবলপ্রেমীরা নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকছেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



