হাইলাইটস:
- ব্রাজিলে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়, জাতীয় আবেগ ও পরিচয়ের অংশ।
- আমেরিকায় বিশ্বকাপের উন্মাদনা মূলত স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন ও নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ।
- ব্রাজিলের দৈনন্দিন জীবন জাতীয় দলের খেলার সূচি মেনে চলে।
- ছোট গ্রাম থেকে বড় শহর—সর্বত্র ফুটবলই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
- ম্যাচের আগে বিশ্লেষণ, ম্যাচ চলাকালীন উন্মাদনা, পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা—এটাই ব্রাজিলের সংস্কৃতি।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের আবহ পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক অনুভূতিগুলোর একটি। কিন্তু আমেরিকায় সেই আবেগ মূলত স্টেডিয়াম, আশপাশের রাস্তা এবং সমর্থকদের উৎসবমঞ্চের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর আগে এমন দৃশ্য দেখা গেছে, তাই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতিতে ফুটবলের অবস্থান এখনও সীমিত।
এই অভিজ্ঞতাই বুঝিয়ে দেয়, আমেরিকায় বিশ্বকাপ দেখা আর ব্রাজিলে বিশ্বকাপ দেখা কতটা ভিন্ন। উত্তর আমেরিকায় ব্রাজিল দলের খেলা কভার করার পর এখন আমি ব্রাজিলে ফিরে এসেছি। এখানে এসে আবার উপলব্ধি করছি—বিশ্বকাপে ব্রাজিল জাতীয় দলই আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এর কারণ, ফুটবল আমাদের সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
আমেরিকায় ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা নয়। সেখানে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে আমেরিকান ফুটবল, বেসবল ও বাস্কেটবলের। এর সঙ্গে রয়েছে অলিম্পিকের বিশাল আকর্ষণ। দেশটিতে থেকে বিশ্বকাপের পরিবেশ দেখার পর আমার মনে হয়েছে, পরিসংখ্যান যা বলে, বাস্তবও ঠিক তাই—বিশ্বকাপ সেখানে বড় একটি ক্রীড়া আসর হলেও, জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়।
অন্যদিকে ব্রাজিলে ফিরে এলেই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে বিশ্বকাপ এমন এক আবেগ সৃষ্টি করে, যা কোটি মানুষের জন্য এক ধরনের মানসিক মুক্তি। কঠোর পরিশ্রম আর নানান কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষ এই মঞ্চে যেন গোটা পৃথিবীকে বলতে চায়—দেখো, আমরা কী করতে পারি। ফুটবলের মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতীয় গৌরবকে নতুন করে অনুভব করে।
এই গর্ব শুধু আমাদের জার্সির ওপর থাকা পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের তারকায় সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা, খেলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সুন্দর ফুটবল দেখলে চোখ জ্বলে ওঠার আনন্দ—সব মিলিয়েই ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
আমেরিকায় থাকাকালে অনেক সময় টেলিভিশন চালিয়ে ফুটবল ম্যাচ খুঁজে পাওয়াই কঠিন ছিল। কিন্তু ব্রাজিলে সেই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে দিনের যে সময়ই টিভি চালান না কেন, পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তের ফুটবল ম্যাচ সম্প্রচার হচ্ছে। ভলিবল, মোটর রেসিং কিংবা বাস্কেটবলেরও জনপ্রিয়তা রয়েছে, কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা চলে না।
আমরা নিজেদের দেশকে ‘ফুটবলের দেশ’ বলে ডাকি। বিশ্বকাপ চলাকালে ব্রাজিলের জীবনযাত্রার ছন্দ নির্ধারণ করে জাতীয় দলের ম্যাচ। অফিসের সময়সূচি বদলে যায়, অনেক সরকারি পরিষেবার কাজের ধরনও পরিবর্তিত হয়। জীবন পুরোপুরি থেমে যায় না, কিন্তু সবাই চেষ্টা করে নিজেদের কাজকর্ম ব্রাজিলের ম্যাচের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে। ম্যাচ শেষ হলে আবার জমে থাকা কাজ একসঙ্গে সেরে নেওয়া হয়।
দল যত এগোয়, উন্মাদনাও তত বাড়ে। মরক্কোর সঙ্গে ড্র, তারপর হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়—প্রতিটি ফলের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। জাপানের বিরুদ্ধে ম্যাচ সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, আর এখন শেষ ষোলোয় নরওয়ের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় গোটা দেশ।
ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই বড় বড় পারিবারিক সমাবেশ, উৎসব আর আনন্দ। তবে শুধু নিজেদের দল নয়, আমরা ভালো ফুটবলও সমানভাবে উপভোগ করি। কোন দেশ খেলছে, সেটি বড় বিষয় নয়। নেদারল্যান্ডস-জাপান, ইকুয়েডর-জার্মানি, উরুগুয়ে-স্পেন, পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স-সুইডেন কিংবা ইংল্যান্ড-গণতান্ত্রিক কঙ্গো—এমন অসংখ্য দুর্দান্ত ম্যাচ ব্রাজিলের দর্শক একই আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন।
ব্রাজিলিয়ানরা শুধু ফুটবল ভালোবাসে না, যারা ফুটবল ভালোবাসে তাদেরও আপন করে নেয়। এই আবেগ দেশের প্রতিটি কোণে একই রকম। রাজধানী হোক বা কয়েকশো মানুষের ছোট্ট কোনো গ্রাম—সব জায়গাতেই ফুটবলই জীবনের সূর্য, আর বাকি সবকিছু সেই সূর্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।
ব্রাজিলে একটি খুব পরিচিত সংলাপ রয়েছে—
‘আজ রাতে সিনেমা বা কনসার্টে যাবে?’
‘যাব, তবে আগে ফুটবল ম্যাচটা শেষ হোক।’
নরওয়ের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ম্যাচের দিন অসংখ্য পরিবার টেলিভিশন কিংবা বড় পর্দার সামনে একসঙ্গে বসবে। ছোট-বড় সবাই মিলে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবে। ম্যাচ শুরুর অনেক আগে থেকেই শুরু হবে আলোচনা, ভবিষ্যদ্বাণী আর বিশ্লেষণ। যেন দেশের ২০ কোটিরও বেশি মানুষই ফুটবল বিশেষজ্ঞ।
তারপর শুরু হবে ৯০ মিনিটের আবেগঘন লড়াই। কেউ কেউ তো চান ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যাক, এমনকি টাইব্রেকারও হোক—শুধু উত্তেজনাটা আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখার জন্য। আর শেষ বাঁশি বাজতেই শুরু হবে ম্যাচ-পরবর্তী তর্ক-বিতর্ক, হাসি-ঠাট্টা, বিশ্লেষণ। কখন শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট; কিন্তু কখন শেষ হবে, তার কোনো সময়সীমা নেই। আর যদি ম্যাচটি শনিবার বা ছুটির আগের দিন হয়, তাহলে সেই আনন্দ যেন আরও দীর্ঘ, আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।