হাইলাইটস:

  • নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টি শক্তি ও ঐক্যের প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল।
  • কিন্তু নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ মোজতবা খামেনেই এখনও প্রকাশ্যে আসেননি।
  • আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা ঘিরে রক্ষণশীল শিবিরেই তীব্র বিভাজন তৈরি হয়েছে।
  • এক পক্ষ কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে, অন্য পক্ষ প্রতিশোধ ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দাবি তুলছে।
  • অন্ত্যেষ্টির পর নতুন নিয়োগগুলিই জানিয়ে দেবে, ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাচ্ছে।

বাংলাস্ফিয়ার: নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর প্রধানরা একত্রিত হলেন, তখন লক্ষ্য ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পরও রাষ্ট্র অটুট, নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ এবং ক্ষমতার কাঠামো অক্ষত রয়েছে।

শুক্রবার শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী এই জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সামরিক ব্যান্ড জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বহু মাস ধরে যাঁদের একসঙ্গে জনসমক্ষে দেখা যায়নি, সেই রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পিকার, বিচার বিভাগের প্রধান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ সেনাধ্যক্ষরা পাশাপাশি হেঁটে উপস্থিত হন। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটিকে শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।

কিন্তু এই দৃশ্যের মাঝেই চোখে পড়ে একটি বড় অনুপস্থিতি।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ মোজতবা খামেনেই কোথাও নেই।

মার্চ মাসে পিতার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। ফলে এই অনুপস্থিতি শুধু কৌতূহলই নয়, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে।

অন্ত্যেষ্টি শুরু হওয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনাকে ঘিরে প্রকাশ্য সংঘাত চলছিল। একে অপরের বিরুদ্ধে বিভ্রমে ভোগা, রাষ্ট্রদ্রোহ, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র, এমনকি নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও তুলেছেন প্রভাবশালী নেতারা।

রাজধানী তেহরানের এক সমাবেশে কট্টরপন্থী কৌশলবিদ হাসান রহিমপুর-আজঘাদি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “যে সময়ে আমাদের নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, সেই সময়ে আমেরিকার সঙ্গে শান্তির কথা বলা লজ্জাজনক।” তাঁর দাবি, আলোচনার বদলে প্রতিশোধই হওয়া উচিত ইরানের একমাত্র পথ।

এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে নতুন সর্বোচ্চ নেতা একটি সতর্ক ভাষায় লিখিত বিবৃতি দেন। কিন্তু সেই বিবৃতি পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরও বিতর্ক সৃষ্টি করে। কট্টরপন্থীরা রাতের বিক্ষোভে স্লোগান দিতে শুরু করে—তাঁরা তখনই শান্ত হবেন, যখন মোজতবা খামেনেই নিজে প্রকাশ্যে আসবেন অথবা অন্তত একটি অডিও বার্তা দেবেন।

এখনও পর্যন্ত তিনি কোনোটিই করেননি।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা এই সপ্তাহে তাঁর পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোনও পর্বে উপস্থিত হবেন কি না, সেটিও এখনও নিশ্চিত নয়। এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিন ইজরায়েল ও আমেরিকার বোমাবর্ষণে নিহত তাঁর স্ত্রী, কিশোর পুত্র এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের স্মরণে বুধবার তেহরানে যে অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানেও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত।

তবু অন্ত্যেষ্টির আয়োজকেরা অনুষ্ঠানটিকে এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছেন, যাতে এটি শুধু আলি খামেনেইকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান না হয়ে তাঁর উত্তরসূরি মোজতবা খামেনেইর প্রতি আনুগত্যের শপথ হিসেবেও প্রতিভাত হয়।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দুই সদস্য এবং অন্ত্যেষ্টি আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিজে অন্ত্যেষ্টির অন্তত একটি পর্বে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে আগামী ৯ জুলাই মাশহাদের ইমাম রেজার পবিত্র দরগায় অনুষ্ঠিতব্য দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তিনি পিতার মরদেহের সামনে জানাজার নামাজ পড়াতে চান।

মার্চ মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম প্রকাশ্য লিখিত বিবৃতিতেও মোজতবা খামেনেই উল্লেখ করেছিলেন, তিনি নিজ চোখে তাঁর পিতার মরদেহ দেখেছেন। সেই বক্তব্যকে অনেকে তাঁর নেতৃত্বের বৈধতার প্রতীকী ঘোষণা হিসেবেও দেখেছেন।

কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এখনও তাঁর প্রকাশ্যে আসার অনুমতি দিতে রাজি নয়।

অন্ত্যেষ্টির প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ওই ব্যক্তিদের দাবি, নিরাপত্তা কর্তাদের আশঙ্কা—মাশহাদের মতো বড় জনসমাবেশে ইজরায়েল নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে। অথবা তাঁর উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি কোথায় আত্মগোপন করে আছেন, সেই তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে।

এই কারণেই আপাতত মোজতবা খামেনেইকে সম্পূর্ণ আড়ালেই রাখা হয়েছে।

কিন্তু এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির রাজনৈতিক মূল্যও বাড়ছে। দেশের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে—যদি সর্বোচ্চ নেতাকে কেউ দেখতে না পান, তিনি জনসমক্ষে কোনও বক্তব্য না দেন, তাহলে বাস্তবে ইরান পরিচালনা করছেন কে?

এই প্রশ্নের মধ্যেই রক্ষণশীল শিবিরের ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

নতুন সর্বোচ্চ নেতার দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু গুঞ্জনই বাড়ায়নি, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে কে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে এত দিন আড়ালে থাকা রক্ষণশীল শিবিরের অন্তর্দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

গত সপ্তাহেই তার একটি নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায়।

সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সরাসরি সম্প্রচারিত এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছিলেন। হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ করে তাঁকে পর্দা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ইরানে প্রবল রাজনৈতিক ঝড় তোলে।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধানের বিরুদ্ধে পদত্যাগের দাবি ওঠে। এই প্রধানকে প্রয়াত আলি খামেনেই নিয়োগ করেছিলেন এবং তিনি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

বহু মাস ধরেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচার চালানো হচ্ছে। তেহরানের বিভিন্ন চত্বরে প্রতিরাতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কট্টরপন্থীরা শুধু আলোচকদের বিচারের দাবিই তোলেননি, তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবিও তুলেছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও সেই আক্রমণের শিকার হন।

অন্ত্যেষ্টির একটি অংশের আয়োজন করতে তিনি যখন ইরাকের একটি শিয়া পবিত্র স্থানে যান, তখন উপস্থিত কয়েকজন ইরানি তীর্থযাত্রী তাঁকে লক্ষ্য করে স্লোগান দিতে থাকেন—“আপসকামীদের মৃত্যু হোক।” সেই দৃশ্যের ভিডিও দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের এক আলোচনায় পরিচিত কট্টরপন্থী বিশ্লেষক ফোয়াদ ইজাদি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে সরকার ও গালিবাফের আলোচক দলকে “মস্তিষ্কহীন” এবং “বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন” বলে কটাক্ষ করেন।

ইরানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। অতীতেও রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্থীদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

আলি খামেনেইর মৃত্যুর পর ক্ষমতার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা রক্ষণশীল শিবিরকেই দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে।

একটি গোষ্ঠী মনে করছে, রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত কমাতে হবে, অর্থনীতি খুলতে হবে এবং কূটনৈতিক সমঝোতার পথেই এগোতে হবে।

অন্যদিকে সংখ্যায় কম হলেও কট্টরপন্থীরা কোনও ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়। তাদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি হোক বা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক—কোনও ক্ষেত্রেই আপস করা যাবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়েই শেষ পর্যন্ত ইরান জয়ী হবে।

এই দ্বন্দ্বই এখন ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

প্রকাশ্যে যে বিভাজন দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার চেয়েও গভীর সংঘর্ষ চলছে ক্ষমতার অন্দরমহলে।

ইরানের চারজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দুই সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইকে নিজেদের পক্ষে টানতে রক্ষণশীল শিবিরের দুই অংশের মধ্যে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। প্রত্যেক পক্ষই চাইছে, ভবিষ্যতের ইরানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা তারাই নির্ধারণ করবে।

তাঁদের দাবি, আপাতত বাস্তববাদী গোষ্ঠীই এগিয়ে রয়েছে।

এই শিবিরে রয়েছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকজন প্রভাবশালী জেনারেল, সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ বাকের জোলঘদর।

কট্টরপন্থীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও এই গোষ্ঠীই যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছনোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।

সরকার-ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক মেহদি রাহমতি বলেন, কট্টরপন্থীদের এত তীব্র আপত্তির কারণ শুধু বর্তমান আলোচনা নয়।

তাঁদের আশঙ্কা, এই আলোচনা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো সীমিত কোনও সমঝোতায় শেষ হবে না। বরং ৪৭ বছরের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে।

রাহমতির কথায়, “আমরা এমন একটি বড় সমঝোতা চাই, যা যুদ্ধের আশঙ্কা দূর করবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ খুলে দেবে। সাধারণ মানুষ এখন শুধু স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চায়।”

রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি দাবি করেছেন, আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার সিদ্ধান্তে নতুন সর্বোচ্চ নেতা সম্মতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “আমি কোনও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না।”

তবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি সফল হয়নি।

আলোচনা মাঝেমধ্যে থমকে যাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন, মাঝেমধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলাও হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করে কট্টরপন্থীরা দাবি করছে, আমেরিকাকে বিশ্বাস করা নির্বুদ্ধিতা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা কখনও এমন নীতিকে সমর্থন করতে পারেন না।

এ কারণেই ক্ষমতার এই সংঘাত এখনও শেষ হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কট্টরপন্থীরা এখন আর শুধু সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। তারা প্রকাশ্যেই অভিযোগ তুলছে, দেশের ভেতরে নীরব এক ‘অভ্যুত্থান’ চলছে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্ব খর্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কট্টরপন্থী আলেম ও সাংসদ মাহমুদ নাবাভিয়ান সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন, “দেশে কি একটি অভ্যুত্থান চলছে?”

একই শিবিরের আরেক সাংসদ কামরান গাজানফারি ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদ বন্ধ রেখে দিয়েছে যাতে আইনপ্রণেতারা সরকারের নীতির বিরোধিতা করতে না পারেন। তাঁর আরও দাবি, জনগণকে অর্থ দিয়ে রাস্তায় না নামার জন্য প্রভাবিত করা হচ্ছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে কোনও জনআন্দোলন গড়ে না ওঠে।

তবে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন বলেই জানাচ্ছেন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

তাঁদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত কয়েক মাসে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশের প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আরও দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সমষ্টিগতভাবে নেওয়া হচ্ছে।

এটাই আলি খামেনেই যুগের সঙ্গে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার আমলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এখন সেই জায়গায় ধীরে ধীরে একটি যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো গড়ে উঠছে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা, বিপ্লবী গার্ড, সরকার এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ—সবাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে সরকারের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্যেও।

ইরানের নির্বাহী বিষয়ক উপরাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-জাফর গায়েমপানাহ সম্প্রতি এক বৈঠকে বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতামত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়।

তাঁর বক্তব্য ছিল, “যদি শুধু সর্বোচ্চ নেতার মতই কার্যকর করতে হয়, তাহলে সংসদ বা সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজন কী?”

ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মন্তব্য কয়েক মাস আগেও অকল্পনীয় ছিল।

কারণ আলি খামেনেই জীবিত থাকাকালীন তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সাহস খুব কম মানুষই দেখাতেন। কিন্তু এখন ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে একক নেতৃত্ব থেকে যৌথ নেতৃত্বের দিকে সরে যাচ্ছে—এমন ইঙ্গিতই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে না আসায় ইরানের ক্ষমতার অভ্যন্তরে নতুন এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—আত্মগোপনে থেকে একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব কি?

ইরানের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রশ্ন নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। তাঁদের মতে, ক্ষমতা গ্রহণের পর মোজতবা খামেনেইর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে তিনি নাকি যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক খসড়ায় সম্মতি দিতে দ্বিধায় ছিলেন।

সেই সময় রাষ্ট্রপতি মাসউদ পেজেশকিয়ান তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের দাবি, রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে। আমেরিকার নৌ অবরোধে ইরানের বাণিজ্য কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করা হলে তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।

একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আব্দোলনাসের হেমাতিও নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠান।

সেখানে তিনি সতর্ক করে লিখেছিলেন, নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে আগস্টের শেষ নাগাদ সরকারের বাজেট সংকট চরম আকার নেবে। খাদ্য ও জরুরি ওষুধের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। কারণ, ইরানের পক্ষে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল রপ্তানি করা বা বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজে পাওয়া তখন আর সম্ভব হবে না।

সরকারি সূত্রগুলির দাবি, এই দুটি বার্তাই শেষ পর্যন্ত মোজতবা খামেনেইর সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।

পরবর্তীতে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি জানান, নীতিগতভাবে তিনি এই সমঝোতার বিরোধী। তবে যদি সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সমর্থন করে, তাহলে সরকার আলোচনার পথে এগোতে পারে।

রাষ্ট্রপতি পেজেশকিয়ানের দাবি, পরিষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে ১২ জনই সেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

এখন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হলেই নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিচার বিভাগের প্রধান, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার নেতৃত্ব, বাসিজ বাহিনীর প্রধান এবং নিজের মুখ্য সচিব—এই সব গুরুত্বপূর্ণ পদে কাদের নিয়োগ করা হয়, সেটিই জানিয়ে দেবে তিনি শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক শিবিরের ওপর বেশি আস্থা রাখছেন।

ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ মোজতবা খামেনেইর ক্ষমতায় আরোহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা অন্য একজন প্রার্থীকে সামনে আনতে চেয়েছিল।

অতএব, এই নিয়োগগুলি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না; এগুলিই নির্ধারণ করবে, খামেনেই-পরবর্তী ইরানের রাজনৈতিক ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভালি নাসর পরিস্থিতির সারমর্ম টেনে বলেছেন, “আমরা ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বাস্তব ও তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করছি। যদি বাস্তববাদীরা জয়ী হয়, তাহলে কট্টরপন্থীরা প্রান্তে সরে যাবে। আর সেই কারণেই তারা এখন সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করছে।”