নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে প্রবেশ রুখতে কঠোর নিয়মের ভাবনা, ভারতে বাধ্যতামূলক কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগের প্রস্তাব
হাইলাইটস
- ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য আরও কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো আনার কথা ভাবছে কেন্দ্র।
- ভারতে পরিষেবা চালাতে হলে প্রতিটি সংস্থাকে দেশে একজন কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ করতে হতে পারে।
- নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট, অবৈধ জুয়া, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ ও বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশে ভিপিএনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
- তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধি আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করাই সরকারের লক্ষ্য।
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বনাম জাতীয় নিরাপত্তা—এই বিতর্ক আবারও সামনে আসতে পারে।
ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএনের ব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে, ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ওয়েবসাইট, অবৈধ বেটিং প্ল্যাটফর্ম, প্রতারণামূলক আর্থিক পরিষেবা এবং বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভিপিএনের অপব্যবহার সরকারের নজরে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ভিপিএন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির উপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের খবর, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—ভারতে পরিষেবা দিতে চাইলে প্রতিটি ভিপিএন সংস্থাকে দেশে একজন কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ করতে হতে পারে। এই আধিকারিকের দায়িত্ব হবে ভারতীয় আইন, আদালতের নির্দেশ এবং সরকারি সংস্থার বৈধ নির্দেশিকা অনুযায়ী সংস্থার কার্যকলাপ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ও করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বহু ব্যবহারকারী ভৌগোলিক বিধিনিষেধ এড়াতে বা সরকারি নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে ভিপিএনের সাহায্য নিচ্ছেন। এর ফলে এমন সব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে, যেগুলি নিরাপত্তা, প্রতারণা বা জনস্বার্থের কারণে ভারতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনলাইন জুয়া, আর্থিক প্রতারণা, মাদক পাচার, শিশু নির্যাতনমূলক সামগ্রী এবং সাইবার হামলার ক্ষেত্রেও ভিপিএনের ব্যবহার তদন্তকে জটিল করে তুলছে বলে মনে করছে সরকার।
এই কারণেই সরকার চাইছে, ভারতে পরিষেবা দেওয়া প্রতিটি ভিপিএন সংস্থার একটি নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা থাকুক। বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার ভারতে কোনও আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নেই। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া বা আইনি নোটিশ কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির ক্ষেত্রেও দেশে অভিযোগ নিষ্পত্তি আধিকারিক এবং নোডাল যোগাযোগ আধিকারিক রাখার বিধান আনা হয়েছিল। এবার সেই মডেল ভিপিএন পরিষেবা প্রদানকারীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে বিষয়টি সহজ নয়। কারণ ভিপিএনের অন্যতম বড় আকর্ষণই হল ব্যবহারকারীর পরিচয় ও ইন্টারনেট ব্যবহারের গোপনীয়তা রক্ষা করা। বহু ব্যক্তি ও সংস্থা সাইবার নিরাপত্তা, দূরবর্তী অফিসে সংযোগ, সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষা এবং গণপর্যবেক্ষণ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার জন্য বৈধভাবেই ভিপিএন ব্যবহার করেন। ফলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের প্রশ্নও সামনে আসবে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হলেও এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে অযথা বাধা সৃষ্টি হয়। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘নো-লগ’ নীতি অনুসরণ করে, অর্থাৎ তারা ব্যবহারকারীর কার্যকলাপের তথ্য সংরক্ষণই করে না। সেই ক্ষেত্রে সরকারের তথ্য চাওয়ার নির্দেশ এবং সংস্থার গোপনীয়তা নীতির মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
সরকারের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হল, বিভিন্ন বিদেশি ডিজিটাল পরিষেবা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের ক্ষেত্রেও অনেক ব্যবহারকারী ভিপিএনের সাহায্যে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে বলে প্রশাসনের ধারণা। ২০২২ সালে কেন্দ্র তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশিকায় কিছু ক্ষেত্রে ভিপিএন পরিষেবা প্রদানকারীদের নির্দিষ্ট গ্রাহক তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই সময় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারতের সার্ভার গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জানায়, তারা ব্যবহারকারীর তথ্য সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে আপস করবে না। এবার নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো আনা হলে সেই বিতর্ক আবারও নতুন করে সামনে আসতে পারে।
সরকারি মহলের মতে, উদ্দেশ্য ভিপিএন নিষিদ্ধ করা নয়; বরং এমন একটি দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরি করা, যাতে বৈধ ব্যবহার অব্যাহত থাকে, কিন্তু অপরাধমূলক কাজে এর অপব্যবহার রোধ করা যায়। বিশেষ করে সাইবার প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকার এখন আরও সক্রিয় অবস্থান নিতে চাইছে। নীতিগত আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রক, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শিল্পমহল এবং ভিপিএন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে স্পষ্ট যে, ভারতে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী অধ্যায়ে ভিপিএন পরিষেবাগুলিও সরকারের বাড়তি নজরদারির আওতায় আসতে চলেছে।