হাইলাইটস:
- কাতারের দোহায় বুধবার থেকে ফের শুরু হচ্ছে পরোক্ষ আলোচনা
- অন্তত ৬০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্তির বিষয়টি মূল এজেন্ডায়
- হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের ইরানি পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন
- পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নির্ধারিত ৬০ দিনের আলোচনাই এখনও শুরু হয়নি
- ইউরোপকে হরমুজে মাইন অপসারণে না আসার কড়া সতর্কবার্তা তেহরানের
বাংলাস্ফিয়ার: অন্তত ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ পর্যায়ের আলোচনা বুধবার থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় আবার শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইরান। তবে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার পরও দুই দেশের প্রতিনিধিদের এখনও মুখোমুখি বৈঠক হয়নি।মঙ্গলবার মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার আঞ্চলিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য কাতারে ছিলেন। আলোচ্যসূচিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং লেবাননের পরিস্থিতিও ছিল। তবে কাতারের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি স্পষ্ট করে দেন, এই বৈঠকগুলি কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে হয়েছে, ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে নয়। তাঁর কথায়, “ইরানিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তাঁরা এখানে আসেননি।”
এদিকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইরান যে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে, তার বিস্তারিত জানতে চাইছে আমেরিকা। পাশাপাশি ওমান যে নৌ-চলাচল সংক্রান্ত পরিষেবার জন্য নির্দিষ্ট ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, তার সঙ্গে ইরানের পরিকল্পনার সম্পর্ক কী, সেটিও খতিয়ে দেখছে ওয়াশিংটন।
১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর করার বিষয়ে এখনও সরাসরি আলোচনায় বসতে না পারার পেছনে রয়েছে একাধিক মতবিরোধ। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজ চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইরানের অনড় অবস্থান। পাশাপাশি, ইজরায়েল, আমেরিকা এবং লেবানন সরকারের উদ্যোগে গত সপ্তাহে আলোচিত লেবানন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেরও বিরোধিতা করছে তেহরান।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যে আলোচনার জন্য ১৭ জুন থেকে মাত্র ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেই আলোচনা এখনও শুরুই হয়নি। সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে এই ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়ানো সম্ভব হলেও, কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অগ্রগতির এই ধীর গতি ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মঙ্গলবার তেহরানে সাংবাদিক বৈঠকে ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ফ্রান্স ও ব্রিটেন-সহ ইউরোপীয় দেশগুলিকে হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণের কাজে অংশ না নেওয়ার সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, “ইরান নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে বেশি সচেতন এবং সেই দায়িত্ব পালন করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। বাইরের কারও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। সদিচ্ছা থেকেও যদি কেউ হস্তক্ষেপ করে, তাতেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।”
হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজের উপর ইরানের শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে পশ্চিমি দেশগুলি। তবে ওমানের প্রস্তাব—নির্দিষ্ট নৌ-পরিষেবার জন্য স্বেচ্ছা অনুদান বা পরিষেবা-ভিত্তিক ফি—নিয়ে আলোচনায় তাদের আপত্তি তুলনামূলকভাবে কম।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, “হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব ইরান ও ওমানের হাতে। এই প্রণালীতে চলাচল ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থার অধীনেই হবে।” তিনি আরও জানান, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী মাত্র ৬০ দিনের জন্যই শুল্কমুক্ত চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে।
এদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) হরমুজ প্রণালীতে ওমান উপকূল ঘেঁষে নতুন নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরানের আপত্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালাচ্ছে। আমেরিকা ও ওমানের সহযোগিতায় এই নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গত সপ্তাহে এক পর্যায়ে আইএমও মনে করেছিল, ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের সম্মতি মিলেছে। কিন্তু পরে ইরান দুটি জাহাজে হামলা চালায়। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, হরমুজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ খর্ব হওয়ার আশঙ্কাতেই এই পদক্ষেপ নেয় তেহরান।
এরপর আইএমও-র মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ নতুন নৌপথ চালুর পরিকল্পনা স্থগিত রেখে ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেন।
সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালী দিয়ে ৪০টি জাহাজ যাতায়াত করেছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ২৪, আর শনিবার ছিল ৩৯।
২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শত শত জাহাজ এই অঞ্চলে আটকে রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার নাবিক দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে আটকে পড়েছেন। অনেক জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ইরান মনে করতে পারে, বর্তমান জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চাপে রাখার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ইরান।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটলেও মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে তুলনামূলক আশাবাদী সুর শোনা গেছে ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বাঘাইয়ের বক্তব্যে। তিনি বলেন, “এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় আমরা যখন শুরু থেকেই অংশ নিয়েছিলাম, তখন কেউই ভাবেনি সবকিছু মসৃণভাবে এগোবে। মনে রাখতে হবে, এক বছরেরও কম সময়ে দুটি যুদ্ধের পর এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাই বাস্তবায়নের পর্যায়ে নানা চ্যালেঞ্জ আসবে, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম।”