হাইলাইটস
- নরওয়ের বিরুদ্ধে মাত্র ২৫ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচসেরা দেম্বেলে।
- সমালোচনার জবাব মাঠেই দিলেন ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী।
- বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ইতিহাসে তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিকের কীর্তি।
- চোট কাটিয়ে ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছেন, আক্রমণে বাড়ছে এমবাপের সঙ্গে বোঝাপড়া।
- তিন ম্যাচে চার গোল করে গোলদাতাদের তালিকায় যৌথ দ্বিতীয় স্থানে।
ফক্সবরোয়ের গিলেট স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উসমান দেম্বেলের মুখে ছিল চাপা হাসি। নরওয়ের বিরুদ্ধে ৪-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে মাত্র ২৫ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার পর তিনি জানতেন, সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাব তিনি মাঠেই দিয়ে ফেলেছেন।
তবু নিজের সাফল্যে ভেসে না গিয়ে দেম্বেলে বারবার একই কথাই বলেছেন, “আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে হবে। কারণ সামনে আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।”
মাঠে অবশ্য তাঁর অভিব্যক্তি ছিল অন্যরকম। দ্বিতীয় গোল করার পর ডান হাতে এমন একটি ভঙ্গি করেন, যা অনেকেই সমালোচকদের উদ্দেশে প্রতীকী জবাব হিসেবে দেখেছেন।
ফ্রান্সের প্রধান কোচের অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্বে থাকা সহকারী কোচ গি স্তেফাঁ বলেন, “দেম্বেলেও মানুষ। সমালোচনা তাঁকেও আঘাত করে। কিন্তু তিনি প্রতিবারই কঠোর পরিশ্রম করে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন। আজ তিনি অসাধারণ কার্যকর ছিলেন। বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা খুবই বিরল ঘটনা।”
নরওয়ের বিরুদ্ধে দেম্বেলের তিনটি শটই জালে জড়ায়। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে তিনি সেই দুর্দান্ত ফর্মের পরিচয় দিলেন, যা তাঁকে ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর এনে দিয়েছিল। বিশেষ করে ক্লাব পর্যায়ে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সের ধারাই এবার জাতীয় দলেও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বকাপে ইরাকের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচেই তিনি একটি গোল ও একটি গোল করিয়েছিলেন। আর নরওয়ের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন ১৯৫৮ সালে জ্যুস্ত ফঁতেন এবং ২০২২ সালে কিলিয়ান এমবাপে।
এমবাপে আগেই সতীর্থ সম্পর্কে বলেছিলেন, “মৌসুমের শেষে ও চোটে পড়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ ফিরে পাবে। আমাদের জন্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ-ও শুরু থেকেই দেম্বেলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচ এবং বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সেনেগালের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স না হলেও তিনি জানতেন, দেম্বেলে তখনও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না।
মে মাসে ফরাসি লিগের শেষ ম্যাচে পায়ের পেশিতে চোট পাওয়ার কারণে তাঁকে অল্প সময়ের মধ্যেই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। পরে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ফাইনালও তাঁকে সম্পূর্ণ ফিট না হয়েই খেলতে হয়।
বিশ্বকাপে আরেকটি বড় পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে। ক্লাবে গত মৌসুমে তিনি মূলত মাঝমাঠের আক্রমণভাগে খেললেও ফ্রান্স দলে এমবাপে ও মিশেল অলিজের উপস্থিতিতে তাঁকে আবার ডান প্রান্তে ফিরে যেতে হয়েছে। সেই পুরোনো অবস্থানেই তিনি নতুন করে নিজের গতি, ড্রিবলিং এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতা দেখাচ্ছেন।
দেশঁর মতে, “দেম্বেলের কোনও সমস্যা নেই। শুধু এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে আবার নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগছে, যেখানে সে সারা বছর খেলে না।”
এমবাপের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়াও আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। নরওয়ের বিরুদ্ধে দেম্বেলের তিন গোলের মধ্যে দুটিরই পাস এসেছে অধিনায়কের কাছ থেকে। এমবাপে নিজেও সম্প্রতি বলেছিলেন, তাঁদের পারস্পরিক সমন্বয় আরও নিখুঁত করার চেষ্টা চলছে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়ায় প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। লক্ষ্য, শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে তাঁকে সতেজ রাখা।
তিন ম্যাচ শেষে দেম্বেলের গোলসংখ্যা এখন চার। গোলদাতাদের তালিকায় তিনি এমবাপে, আর্লিং হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। তাঁদের সবার ওপরে আছেন পাঁচ গোল করা লিওনেল মেসি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এক সপ্তাহ আগেও বড় কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফ্রান্সের হয়ে দেম্বেলের একটি গোলও ছিল না। আর এখন তিনি বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার। তাঁর এই পুনর্জন্ম যদি শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধেও একইভাবে অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রেও তিনি এমবাপে, মেসি বা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতোই বড় তারকায় পরিণত হতে পারেন।