Table of Contents
হাইলাইটস:
- যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের মুখে তৈরি হয়েছে এক নতুন যুদ্ধ-ভাষা।
- ‘মাংস’, ‘গর্ত’, ‘বাতিল’, ‘মুক্তিপণ’— প্রতিটি শব্দের আড়ালে রয়েছে নির্যাতন, দুর্নীতি ও মৃত্যুর গল্প।
- সৈনিক ও তাঁদের পরিবারের চিঠি বিশ্লেষণ করে এই অভিধান তৈরি করেছেন দুই গবেষক।
- এই শব্দগুলি সরকারি প্রচারের বাইরে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে।
বাংলাস্ফিয়ার: ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের দৈনন্দিন জীবনের এক ভয়াবহ ছবি উঠে এসেছে তাদের নিজেদের ব্যবহৃত নতুন কথ্য ভাষায়। পরিখা, অস্থায়ী কারাগার, সামরিক শিবির ও হাসপাতাল— সর্বত্র এমন কিছু শব্দ চালু হয়েছে, যেগুলি শুধু সামরিক পরিভাষা নয়, বরং যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার দলিল।
নৃতত্ত্ববিদ আলেক্সান্দ্রা আরখিপোভা এবং মনোবিজ্ঞানী ইউরি লাপশিন রুশ সেনা, তাঁদের মা, স্ত্রী, বোন ও সন্তানদের লেখা অসংখ্য চিঠি বিশ্লেষণ করে এই শব্দভাণ্ডার তৈরি করেছেন। চিঠিগুলি মস্কোভিত্তিক মানবাধিকার কমিশনারের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জমা পড়েছিল। একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির সুযোগে নির্বাসিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম Echo সেই নথিগুলি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
‘পাখি’ মানেই ড্রোন
রুশ ভাষায় ‘প্তিচকা’ অর্থাৎ ‘ছোট পাখি’ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের প্রতিশব্দ। ড্রোনচালককে বলা হয় ‘প্তিচনিক’ বা ‘পাখির রক্ষক’। এটি সেনাবাহিনীর মর্যাদাপূর্ণ কাজ বলে বিবেচিত হয়।
তবে ভুলের মূল্যও চড়া। কোনও ড্রোন ধ্বংস হলে বা হারিয়ে গেলে অনেক সময় চালককেই নিজের পকেট থেকে নতুন ড্রোন কিনে দিতে বাধ্য করা হয়। একটি ড্রোনের দাম প্রায় ১,৬০০ ইউরো।
অন্যদিকে ইউক্রেনের ড্রোনগুলিকে রুশ সেনারা সবচেয়ে বেশি ভয় পান। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরক ফেলতে আসা ভারী ড্রোন ‘বাবা ইয়াগা’-কে, যার নাম স্লাভ লোককাহিনির এক ভয়ঙ্কর ডাইনির নাম থেকে নেওয়া।
‘বাতিল’ মানেই নিজের সেনার হাতে মৃত্যু
‘অবনুলেনিয়ে’ বা ‘শূন্যে নামিয়ে আনা’ বলতে বোঝানো হয় কোনও সৈনিককে নিজের পক্ষের লোকের হাতেই হত্যা করা, অথবা এমন আত্মঘাতী অভিযানে পাঠানো, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই।
গবেষকদের দাবি, কাপুরুষতার অভিযোগ, ঘুষ দিতে অস্বীকার করা কিংবা আত্মঘাতী অভিযানে যেতে না চাওয়ার মতো কারণে বিচার ছাড়াই অনেক সৈনিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। অনেককে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন আক্রমণে পাঠানো হয়, যা কার্যত মৃত্যুদণ্ডের সমান।
‘গর্ত’ আসলে নির্যাতন শিবির
‘ইয়ামা’ অর্থাৎ ‘গর্ত’ হল মাটির নীচে খুঁড়ে তৈরি অস্থায়ী শাস্তিকক্ষ।
শাস্তিপ্রাপ্ত সৈনিকদের হাত-পা বেঁধে, কখনও উল্টো করে ঝুলিয়ে, কখনও জলভর্তি গর্তে ফেলে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। অনেকের মুখ টেপ দিয়ে বন্ধ করে মারধর, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এবং না খাইয়ে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী এ ধরনের শাস্তি সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু বাস্তবে কোনও লিখিত আদেশ ছাড়াই ঊর্ধ্বতন অফিসাররা এটি ব্যবহার করছেন ভয় দেখানো ও শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে।
‘মাংস’ মানেই কামানের খাদ্য
রুশ সেনাদের ভাষায় ‘মিয়াসো’ বা ‘মাংস’ বলতে বোঝায় সেই সব আক্রমণকারী সৈনিক, যাঁদের কার্যত কামানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ছোট ছোট দলে বারবার আক্রমণে পাঠিয়ে শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত করার কৌশলকে বলা হয় ‘মাংসের আক্রমণ’। এতে হতাহতের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি।
গবেষকদের দাবি, যারা অভিযোগ করেন বা চুক্তি ভাঙতে চান, তাঁদের অনেকের প্রতিশ্রুত সামরিক দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের অভিযানে পাঠানো হয়। অনেক সময় অভিযানের আগে অফিসাররা সৈনিকদের ব্যাঙ্ক কার্ড ও গোপন নম্বর নিয়ে নেন। সৈনিক নিহত হলে সেই অ্যাকাউন্ট থেকেই টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
‘মুক্তিপণ’ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা
‘ওতকুপ’ বা ‘মুক্তিপণ’ হল কমান্ডারকে দেওয়া ঘুষ, যার বিনিময়ে কোনও সৈনিক আত্মঘাতী অভিযান এড়াতে পারেন বা সাময়িক রেহাই পান।
অভিযোগ অনুযায়ী, ছুটি পেতে লাগে অন্তত ৫০ হাজার রুবল, আত্মঘাতী অভিযানে না যেতে ১.৫ লক্ষ রুবল, সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেতে ২ লক্ষ রুবল, যুদ্ধবিহীন দায়িত্বে বদলি হতে ২.৫ লক্ষ রুবল এবং পিছনের নিরাপদ এলাকায় বদলি হতে প্রায় ৪.৭ লক্ষ রুবল পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।
গবেষকদের মতে, যুদ্ধের মোটা বেতন ও বোনাসকে কেন্দ্র করেই সেনাবাহিনীর ভিতরে এক অঘোষিত দুর্নীতির অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। অনেক সৈনিকের ভাগ্য নির্ধারণ করছে যুদ্ধদক্ষতা নয়, বরং ঘুষ দেওয়ার ক্ষমতা।
এই নতুন যুদ্ধ-অভিধান শুধু কিছু শব্দের তালিকা নয়। বরং রুশ সেনাদের অভিজ্ঞতার এমন এক নথি, যেখানে সরকারি প্রচারের বীরত্বগাথার বদলে উঠে এসেছে ভয়, নির্যাতন, দুর্নীতি এবং মৃত্যুর এক নির্মম বাস্তবতা।