হাইলাইটস
- ‘আলফা মেল’ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল, বলছেন গবেষকেরা।
- নেকড়ের আচরণ নিয়ে পুরোনো গবেষণা থেকেই এই ধারণার জন্ম, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
- অতিরিক্ত রুক্ষ চেহারা, রাগী মুখ বা আধিপত্যপূর্ণ আচরণ নারীদের কাছে আকর্ষণীয় নয়।
- পেশিবহুল শরীর কিছুটা আকর্ষণ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে নারীরা সংযত ও ভদ্র পুরুষকেই বেশি পছন্দ করেন।
- নারীদের না বুঝে ‘পুরুষত্ব’ বিক্রির ব্যবসাই চালাচ্ছেন বহু তথাকথিত আলফা-গুরু।
ইন্টারনেটে তথাকথিত ‘আলফা মেল’-এর যে ছবি আঁকা হয়, তা যেন এক নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি—চওড়া চোয়াল, কুঁচকানো ভ্রু, ফুলে ওঠা পেশি, বিপুল অর্থসম্পদ, কড়া জীবনযাপন এবং সর্বক্ষণ আধিপত্যের ভঙ্গি। সামাজিক মাধ্যমে বহু প্রভাবক দাবি করেন, এই বৈশিষ্ট্যই নাকি নারীদের অপ্রতিরোধ্যভাবে আকৃষ্ট করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বাস্তব ছবিটি একেবারেই অন্যরকম। বিজ্ঞানীদের মতে, ‘আলফা মেল’ ধারণাটির ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে। এই শব্দের উৎপত্তি মানুষের সমাজে নয়, বন্দি নেকড়েদের আচরণ নিয়ে ১৯৪৭ সালের একটি গবেষণা থেকে। পরে সেই গবেষণার অন্যতম প্রবক্তা প্রাণীবিজ্ঞানী ডেভিড মেক নিজেই স্বীকার করেন, নেকড়ের সামাজিক কাঠামো এতটা সরল নয়। ফলে মানুষের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে এই তত্ত্ব ব্যবহার করাই ভুল।
তবু গত দুই দশকে এই ধারণা নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রচারকেরা ‘আলফা মেল’-কে আদর্শ পুরুষ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, প্রাচীন যুগের মতো শক্তিশালী, প্রভাবশালী ও কঠোর পুরুষই প্রকৃত পুরুষত্বের প্রতীক। সেই ধারণাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা—অনলাইন প্রশিক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের নানা কোর্স।কিন্তু এই প্রচারের সঙ্গে বাস্তবের মিল কতটা?
২০২৫ সালে প্রকাশিত স্কটল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ জনের মধ্যে তিন জন পুরুষ মনে করেন তাঁদের চেহারা যথেষ্ট ‘পুরুষালি’ নয়। অথচ একই গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষেরা নারীদের পছন্দ সম্পর্কে বড় ধরনের ভুল ধারণা পোষণ করেন। অত্যন্ত চওড়া চোয়াল, অতিরিক্ত উঁচু গালের হাড় কিংবা অস্বাভাবিক রুক্ষ মুখাবয়ব নারীদের কাছে বরং কম আকর্ষণীয়। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হল গড়পড়তা মুখাবয়বকে বেশি পছন্দ করা। মুখের অভিব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘আলফা’ প্রভাবকেরা প্রায়ই রাগী ও কঠোর মুখভঙ্গিকে শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, এমন মুখ নারীদের কাছে আক্রমণাত্মক বলে মনে হয় এবং তাঁরা তা এড়িয়ে চলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বরং হাসিমুখ একজন পুরুষকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।
তবে শরীরচর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন ছবি মিলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুগঠিত শরীর নারীদের আকর্ষণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কাঁধ, বুক ও বাহুর পেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যধিক পেশিবহুল শরীরের চেয়ে মাঝারি গড়নের সুস্থ ও সবল পুরুষকেই বেশি পছন্দ করেন অধিকাংশ নারী। আধিপত্যপূর্ণ আচরণ নিয়েও প্রচলিত ধারণার সঙ্গে গবেষণার ফলের বড় পার্থক্য রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা কেবল শক্তির জোরে কর্তৃত্ব ফলানো পুরুষকে নয়, বরং নিজের দক্ষতা, জ্ঞান ও সাফল্যের মাধ্যমে সম্মান অর্জন করা পুরুষকে বেশি মূল্য দেন। খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় আক্রমণাত্মক মনোভাব গ্রহণযোগ্য হলেও প্রেম বা বিবাহের সম্পর্কে একই আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথাকথিত ‘আলফা’ হওয়ার নামে অনেকেই স্টেরয়েডের মতো ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ করেন। এতে সাময়িকভাবে পেশি বাড়লেও যৌনক্ষমতা হ্রাস, অণ্ডকোষ সঙ্কুচিত হওয়া এবং সাময়িক বন্ধ্যাত্বের মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ফলে এই তথাকথিত পুরুষত্ব অর্জনের মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত চড়া। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি অন্য জায়গায়। যাঁরা ‘আলফা মেল’-এর তত্ত্ব প্রচার করেন, তাঁদের অনেকেই নারীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। অথচ নারীদের কী পছন্দ, তা জানার প্রকৃত আগ্রহ তাঁদের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়। গবেষকদের বক্তব্য, সম্পর্কের মূল ভিত্তি আধিপত্য নয়; পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা ও বোঝাপড়াই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আসল চাবিকাঠি।
অতএব, ‘আলফা মেল’ কোনও বৈজ্ঞানিক সত্য নয়, বরং সামাজিক মাধ্যমনির্ভর এক জনপ্রিয় মিথ। সুস্থ শরীর, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নারীদের আকৃষ্ট করার একমাত্র সূত্র হিসেবে কঠোর পুরুষত্বের যে গল্প বিক্রি করা হয়, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং গবেষণা বলছে, মানুষের প্রতি আন্তরিক আগ্রহ, সৌজন্য এবং সম্মান—এই গুণগুলিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।