Home খবর ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ না আত্মরক্ষার দলিল

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ না আত্মরক্ষার দলিল

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত ট্রাম্প-সমর্থিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর একটি খসড়া প্রস্তাব প্রকাশ্যে এসেছে।
  • খসড়ায় বোর্ডের সদস্য, নিরাপত্তা বাহিনী ও ঠিকাদারদের ব্যাপক আইনি দায়মুক্তির প্রস্তাব রয়েছে।
  • গাজার আদালতে গ্রেপ্তার, আটক বা বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
  • বোর্ডকে বিনা মূল্যে সরকারি জমি ও স্থাপনা ব্যবহারের অধিকার দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
  • আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, এই ব্যবস্থা জবাবদিহির বদলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
  • বোর্ড অব পিস অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এখনও এমন কোনও কার্যকর প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।

গাজা শাসন ও পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা আমেরিকা-সমর্থিত বোর্ড অব পিস নিজেদের জন্য ব্যাপক আইনি দায়মুক্তি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে বলে একটি খসড়া নথি প্রকাশ্যে এসেছে। দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা চার পৃষ্ঠার এই নথিতে বোর্ডের সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী, বিদেশি ঠিকাদার এবং গাজায় কাজ করা বিভিন্ন কর্মীর বিরুদ্ধে স্থানীয় আদালতে গ্রেপ্তার, আটক বা বিচারিক প্রক্রিয়া চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

‘সংবেদনশীল, তবে অশ্রেণিবদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত ‘রেজল্যুশন নং ২০২৬/৩’-এ বলা হয়েছে, বোর্ড অব পিস ও এর সহযোগী সংস্থা অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ (ওএইচআর)-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে গাজার কোনও আদালত বা প্রশাসনিক সংস্থা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে না। নথিতে স্পষ্ট নয়, এই দায়মুক্তি কেবল গাজার বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, নাকি আন্তর্জাতিক আদালতের ক্ষেত্রেও কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে। খসড়া অনুযায়ী, বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনও ব্যক্তির দায়মুক্তি প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখবেন। তবে তার জন্য বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। যদিও বোর্ডের পক্ষ থেকে এই দাবি অস্বীকার করে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের এমন কোনও ভূমিকা থাকবে না।

বোর্ড অব পিসের সাত সদস্যের নির্বাহী পর্ষদে রয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, হোয়াইট হাউসের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুসি ওয়াইলস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও। বিভিন্ন দেশ গাজার পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও অধিকাংশ অর্থ ছাড় হয়নি এবং বড় কোনও পুনর্গঠন প্রকল্পও শুরু হয়নি। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে প্রশ্নগুলো বোর্ড অব পিসের কাছে পাঠিয়ে দেয়। বোর্ডের এক মুখপাত্র লিখিত বিবৃতিতে জানায়, প্রতিবেদনে বর্ণিত ধরনের কোনও কার্যকর দায়মুক্তির কাঠামো এখনও গৃহীত হয়নি। তিনি দাবি করেন, বোর্ডের উদ্দেশ্য কোনওভাবেই আইনের শাসনকে দুর্বল করা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মী, ঠিকাদার ও সংস্থাগুলি প্রযোজ্য আইন, তদারকি এবং জবাবদিহির আওতায় থেকেই কাজ করবে। তবে সেই জবাবদিহির কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে গাজার জন্য বোর্ড অব পিসের উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ কায়রোতে বোর্ড-নির্বাচিত ফিলিস্তিনি প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। সেখানে গাজা পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিতর্কিত এই দায়মুক্তির খসড়া এখনও ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আমেরিকার সরকারি চুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছয়জন আইনজীবী নথিটি পর্যালোচনা করে দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বোর্ডের সদস্য, নিরাপত্তা বাহিনী বা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ, দুর্ঘটনা, সম্পত্তির ক্ষতি কিংবা বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট নয়।

ইজরায়েল, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের আদালতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নিয়ে কাজ করা আইনজীবী এমিলি শ্যাফার ওমের-ম্যান বলেন, নথিটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে বোর্ড ও তার কর্মীদের সম্ভাব্য আইনি দায় থেকে রক্ষা করা যায়। তাঁর মতে, এটি জবাবদিহি এড়ানোর প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নুরা এরাকাত আরও কঠোর ভাষায় বলেন, খসড়াটি কার্যত বোর্ড অব পিসের জন্য একটি আলাদা বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে বাইরের কোনও আদালত বা আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর তদারকি থাকবে না।

নথির সপ্তম ধারায় বলা হয়েছে, বোর্ড নিজেই সম্পত্তির ক্ষতি, ব্যক্তিগত আঘাত, অসুস্থতা বা মৃত্যুর মতো অভিযোগের নিষ্পত্তি করবে। সমালোচকদের মতে, অভিযোগের বিচারক এবং অভিযুক্ত—উভয় ভূমিকাতেই বোর্ড নিজেকে বসাতে চাইছে। পুনর্গঠনের কাজে অংশ নিতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক ঠিকাদার সংস্থাগুলিও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর দাবি জানিয়েছে। অতীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকার ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বেসামরিক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল এবং বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলেছে। তাই গাজায় কাজ শুরুর আগে দায়বদ্ধতা ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে পরিষ্কার নীতিমালা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলির একটি রয়েছে নথির শেষ অধ্যায়ে। সেখানে বলা হয়েছে, বোর্ড অব পিস ও তার নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি জমি, ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা বিনা মূল্যে তাদের ব্যবহারের জন্য দিতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই বিধান কার্যকর হলে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তি অধিগ্রহণ বা দখলের পথ সহজ হয়ে যেতে পারে। নথিতে কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি, এই সম্পত্তি হস্তান্তরের দায়িত্ব কার—ইজরায়েল, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, নাকি অন্য কোনও প্রশাসনিক সংস্থার। বোর্ড অব পিস গাজায় একটি আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটি ও একাধিক রসদকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এই বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হবে হামাসকে নিরস্ত্র করতে সহায়তা করা, যা ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন ডন-এর নির্বাহী পরিচালক ওমর শাকির বলেন, ক্ষতিপূরণ বা সম্মতি ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের জমি ও স্থাপনা ব্যবহারের ক্ষমতা দাবি করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এটি দখলদারিত্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস-এর নীতি-পরিচালক ব্র্যাড পার্কার প্রশ্ন তুলেছেন, ইজরায়েলের সঙ্গে যদি কোনও আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা বা বাহিনীর অবস্থান-সংক্রান্ত চুক্তিই না থাকে, তাহলে বোর্ড অব পিসের এমন ক্ষমতার আইনি ভিত্তি কোথায়।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজার প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব বোর্ড অব পিসকে দিয়েছে। জাতিসংঘের কূটনীতিক ও সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক আইনে নির্দিষ্ট কিছু দায়মুক্তি ভোগ করলেও, সেই সুরক্ষা বোর্ড অব পিসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। খসড়া নথিতে বলা হয়েছে, উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ স্বাক্ষর করলেই প্রস্তাবটি কার্যকর হবে। তবে অন্য কোনও পক্ষের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে কি না, সে বিষয়ে বোর্ড এখনও কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে খসড়া নথিটি প্রকাশ্যে আসার পর গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, আন্তর্জাতিক আইন এবং জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles