হাইড্রেশন নয়, বিজ্ঞাপনের বিরতি: বিশ্বকাপের ফুটবলকে চার কোয়ার্টারে ভাঙার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন বিরতি’কে ঘিরে বাড়ছে সমর্থকদের ক্ষোভ।
- বহু স্টেডিয়ামে এই বিরতি শুরু হলেই দর্শকদের তুমুল দুয়ো শোনা যাচ্ছে।
- সমালোচকদের দাবি, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের অজুহাতে আসলে বিজ্ঞাপনের সময় বাড়িয়েছে ফিফা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস
- বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন বিরতি’কে ঘিরে বাড়ছে সমর্থকদের ক্ষোভ।
- বহু স্টেডিয়ামে এই বিরতি শুরু হলেই দর্শকদের তুমুল দুয়ো শোনা যাচ্ছে।
- সমালোচকদের দাবি, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের অজুহাতে আসলে বিজ্ঞাপনের সময় বাড়িয়েছে ফিফা।
- এই বিরতি ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ, কৌশল এবং নাটকীয়তাকে নষ্ট করছে বলে মত বহু কোচ ও ফুটবলারদের।
- নিবন্ধকারের অভিযোগ, এটি ফুটবলের মৌলিক কাঠামো বদলে দেওয়ার এক বিপজ্জনক পদক্ষেপ।
ইংল্যান্ড-ঘানা ম্যাচে এক খেলোয়াড়ের চোটের কারণে খেলা থেমে গেলে দুই দলের কয়েকজন ফুটবলার মাঠের ধারে গিয়ে নিজেরাই জল খেতে শুরু করেন। কিন্তু এতেই যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ম্যাচ কর্মকর্তারা। তাঁরা দৌড়ে গিয়ে খেলোয়াড়দের থামিয়ে দেন। কারণ, নির্ধারিত ‘হাইড্রেশন বিরতি’ তখনও শুরু হয়নি।
এ যেন জল খাওয়াও এখন নিয়ন্ত্রিত! কারণ, নির্ধারিত বিরতির আগে জল খেলে বিজ্ঞাপনের সময়সূচি নষ্ট হতে পারে। টেলিভিশনের পর্দায় যে বিজ্ঞাপনগুলি দেখানোর কথা, সেগুলির জন্যই যেন এই বিরতির প্রকৃত আয়োজন।
নির্ধারিত হাইড্রেশন বিরতি শুরু হতেই স্টেডিয়ামে দর্শকদের তীব্র দুয়ো শোনা যায়। অথচ ম্যাচটি এতটাই নিষ্প্রাণ ছিল যে এই বিরতিই যেন একমাত্র সামান্য উত্তেজনা এনে দিয়েছিল। শুধু ইংল্যান্ড-ঘানা নয়, ডাচ, স্প্যানিশ, চেক, মেক্সিকান, জাপানি, কলম্বিয়ান এবং সৌদি সমর্থকরাও বিভিন্ন ম্যাচে এই বিরতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ব্যতিক্রম ছিল ব্রাজিল ও হাইতির সমর্থকেরা, যারা উৎসবের আবহেই বেশি মেতে ছিলেন।
একটি ম্যাচে বিরতির সময় পরিবেশকে প্রাণবন্ত করতে ট্রাম্পেট বাজিয়ে ব্যান্ডও নামানো হয়েছিল। কিন্তু তাতেও বিরক্তি আরও বেড়েছে। অনেকেরই মনে হয়েছে, খেলার আবহ হঠাৎ ভেঙে গিয়ে যেন অন্য কোনও বিনোদন অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়েছেন তাঁরা।
বিশ্বকাপে এই নতুন ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্টির তালিকা দীর্ঘ। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করেছেন। কিংবদন্তি কোচ মার্সেলো বেলসা বলেছেন, এটি ফুটবলের আত্মাকেই আঘাত করছে। জার্মানির কাই হাভার্টজও একে বিরক্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, এই ব্যবস্থার প্রকাশ্য সমর্থক কার্যত মাত্র দু’জন। একজন রাল্ফ রাংনিক, যিনি চান ইউরোপীয় ফুটবলেও এই বিরতি চালু হোক। অন্যজন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, যিনি এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা।
সমালোচকদের অভিযোগ, একে ‘হাইড্রেশন বিরতি’ বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি বিজ্ঞাপনের বিরতি। ‘খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা’ বলে বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা হয়েছে। অথচ প্রয়োজনে শুধু কয়েক সেকেন্ডের জন্য জল পান করার সুযোগ দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। তার বদলে তিন মিনিটের দীর্ঘ বিরতি স্পষ্টভাবেই সম্প্রচার সংস্থাগুলির সুবিধার জন্য।
এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্যত ৯০ মিনিটের ফুটবলকে চারটি অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ফুটবলের ইতিহাসে ১৮৯৭ সালে দুই অর্ধে ৪৫ মিনিট করে খেলার নিয়ম চালুর পর এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আর হয়নি। বদলে যাচ্ছে শুধু সময়ের হিসাব নয়, খেলার স্বাভাবিক ছন্দও।
ফুটবলের অন্যতম সৌন্দর্য হল, একটানা দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্তি, চাপ, ভুল এবং মুহূর্তের সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে যাওয়া। সেই ধারাবাহিকতাই ভেঙে দিচ্ছে এই বাধ্যতামূলক বিরতি। কোচরা নতুন করে কৌশল সাজানোর সুযোগ পাচ্ছেন, ক্লান্ত দল বিশ্রাম নিয়ে আবার সংগঠিত হচ্ছে, ফলে খেলার স্বাভাবিক গতি থেমে যাচ্ছে।
লেখকের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অতিরিক্ত বিরতি মানেই অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, বেশি সম্প্রচার আয় এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির সুযোগ। সেই অর্থে এটি খেলোয়াড়দের জন্য নয়, বরং ব্যবসার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত।
এই প্রসঙ্গে টেলিভিশনে ডেভিড বেকহ্যামের ঘনঘন উপস্থিতিকেও লেখক কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের আসল নায়ক হওয়ার কথা ফুটবলারদের, কিন্তু বিজ্ঞাপনের এই নতুন সংস্কৃতিতে অবসরপ্রাপ্ত তারকারাই যেন বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছেন।
মার্সেলো বেলসার মতো কোচদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ফুটবলের কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হবে। একটানা ৪৫ মিনিট ধরে প্রতিপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করা বা ক্লান্তির সুযোগ নেওয়ার যে শিল্প, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। ফুটবল হয়ে উঠবে আরও নিয়ন্ত্রিত, আরও পরিকল্পিত এবং কম স্বতঃস্ফূর্ত।
লেখক মনে করিয়ে দেন, ফুটবলের শক্তি তার সরলতায়। এটি দীর্ঘ, কঠিন এবং অনেক সময় একঘেয়েও হতে পারে। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই জন্ম নেয় নাটকীয় মুহূর্ত, অপ্রত্যাশিত গোল এবং ইতিহাস। সেই বৈশিষ্ট্যকে ভেঙে বিজ্ঞাপননির্ভর বিনোদনে পরিণত করা হলে খেলাটির মৌলিক চরিত্রই বিপন্ন হবে।
সবশেষে লেখকের আবেদন, সমর্থকদের এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, এই তিন মিনিটের বিরতি শুধু জল খাওয়ার জন্য নয়; এটি এমন এক বাণিজ্যিক হস্তক্ষেপ, যা ধীরে ধীরে ফুটবলের আত্মাকেই বদলে দিতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



