একদিকে আহতদের জীবন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে স্বজনদের উৎকণ্ঠার প্রহর
হাইলাইটস
- তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের পর একের পর এক আহতকে আনা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে।
- জরুরি বিভাগে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতাল কর্মীরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চিকিৎসা শুরু করেন।
- গুরুতর আহতদের দ্রুত অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়।
- হাসপাতালে ভিড় জমান আহতদের পরিবার ও সহকর্মীরা; অনেকেই প্রিয়জনের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন।
- রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ কর্তারা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নজরদারি করেন।
তারাতলার নির্মীয়মাণ তিনতলা গুদাম ধসের পর সবচেয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল। দুর্ঘটনাস্থল থেকে একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স এসে পৌঁছতেই জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীরা কার্যত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজে নেমে পড়েন। গুরুতর আহতদের দ্রুত ট্রায়াজ বা অগ্রাধিকারভিত্তিক বাছাই করে কার কেমন চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হয়। যাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল, তাঁদের সরাসরি অস্ত্রোপচার কক্ষ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ আহতেরই শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত, হাড় ভাঙা, মাথায় চোট এবং বুকে আঘাতের মতো জটিল সমস্যা ছিল। অর্থোপেডিক, ট্রমা সার্জারি, অ্যানাস্থেশিয়া, নিউরোসার্জারি এবং জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একাধিক দল গঠন করা হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় রক্ত, ওষুধ এবং অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয় যাতে কোনও রোগীর চিকিৎসায় বিলম্ব না হয়।
জরুরি বিভাগের বাইরে তখন এক ভিন্ন ছবি। হাসপাতালের করিডর এবং অপেক্ষমাণ এলাকায় উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং সহকর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ ফোনে খবর জানাচ্ছেন, কেউ চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রিয়জনের অবস্থার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকেই দুর্ঘটনার পরে শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে হাসপাতালেই ছুটে আসেন। আহতদের নামের তালিকা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, যাঁদের খোঁজ মিলছিল না, তাঁদের উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করে। রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের তথ্য জানাতে পৃথক সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি বিভাগের প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়, যাতে চিকিৎসার কাজে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। একই সঙ্গে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগকে সতর্ক রাখা হয়, প্রয়োজনে আরও শয্যা এবং চিকিৎসা পরিকাঠামো প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরাও সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন। গুরুতর আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের নির্দেশ ছিল, রোগীদের প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসার পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হবে। হাসপাতালে রক্তের চাহিদা বাড়লে তা পূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়।
দুর্ঘটনার পর এসএসকেএমের এই তৎপরতা আবারও দেখিয়ে দিল, বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলির জরুরি সাড়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের কাছে এটি ছিল প্রতিটি মিনিটের সঙ্গে সময়ের লড়াই। আর হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলির কাছে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তা আর প্রার্থনার। জীবন বাঁচানোর সেই লড়াই এখনও চলছে, কারণ গুরুতর আহতদের অনেকেই চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।