Home খবর ব্রেক্সিটের ১০ বছর: প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় মূল্য, অনুশোচনায় ব্রিটেন

ব্রেক্সিটের ১০ বছর: প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় মূল্য, অনুশোচনায় ব্রিটেন

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
29 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতি আজ সম্ভাব্য অবস্থানের তুলনায় ৪% থেকে ৬% ছোট বলে মনে করেন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ।
  • ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যে নতুন বাধা তৈরি হওয়ায় রপ্তানি ও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
  • নতুন বাণিজ্য চুক্তিগুলি ইউরোপীয় বাজার হারানোর ক্ষতি পূরণ করতে পারেনি।
  • ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও শ্রমবাজার দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কার মুখে পড়েছে।
  • লন্ডন এখনও ইউরোপের প্রধান আর্থিক কেন্দ্র হলেও ধীরে ধীরে কিছু ব্যবসা অন্য শহরে সরে গেছে।
  • ব্রিটিশ জনমতের বড় অংশ এখন মনে করে ব্রেক্সিট প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল দিয়েছে।

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোট ছিল ব্রিটেনের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকার প্রশ্নে দেশ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ভোটের আগে তৎকালীন সরকার সতর্ক করেছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে গেলে ব্রিটিশ অর্থনীতি “তাৎক্ষণিক ও গভীর ধাক্কা” খাবে। কিন্তু গণভোটে অল্প ব্যবধানে ‘লিভ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষ জয়ী হয়। সেই সতর্কবার্তা তখন অনেকের কাছে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ ব্রিটেনের অর্থনীতি সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়েনি। কিন্তু এক দশক পর অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের মূল্যায়ন হলো, সতর্কবার্তাটি ভুল ছিল না, ভুল ছিল কেবল তার সময় নির্ধারণ। ধাক্কা এসেছিল, তবে ধীরে ধীরে। আর সেই ক্ষতির বোঝা বছরের পর বছর জমা হয়েছে।

অর্থনীতির পাশাপাশি ব্রেক্সিট ব্রিটিশ রাজনীতিকেও অস্থির করে তুলেছে। গণভোটের পর থেকে দেশটি একের পর এক রাজনৈতিক সংকট দেখেছে। মাত্র দশ বছরে ব্রিটেন সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে চলেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ সেই অস্থিরতার নতুন উদাহরণ। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনেও হতাশা বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রায় অর্ধেক ব্রিটিশ নাগরিক বলেছেন, ব্রেক্সিট তাদের প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল দিয়েছে। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরে যাওয়ার পক্ষে।

অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত?

ব্রেক্সিটের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ এর মধ্যে কোভিড মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন শুল্কনীতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর একাধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবু বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রেক্সিটের প্রভাব আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করেছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাস ব্লুমের নেতৃত্বে পরিচালিত এক বহুল আলোচিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সম্ভাব্য অবস্থার তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। যদিও সব অর্থনীতিবিদ এই হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন, তবুও তাদের মধ্যে একটি সাধারণ ঐকমত্য রয়েছে। অধিকাংশের মতে, ব্রিটেনের অর্থনীতি বর্তমানে ৪ থেকে ৬ শতাংশ ছোট, যদি দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবেই থেকে যেত। এর অর্থ হলো কম উৎপাদন, কম আয়, কম কর রাজস্ব এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের গতি হ্রাস। ব্রিটেনের স্বাধীন আর্থিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি’ মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে ব্রেক্সিট দেশের উৎপাদনশীলতা প্রায় ৪ শতাংশ কমিয়ে দেবে।

বাণিজ্যে বেড়েছে বাধা

ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি এসেছে বাণিজ্য খাত থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একক বাজার। প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের এই বাজার ব্রিটেনের একেবারে পাশেই অবস্থিত। সদস্য থাকার সময় ব্রিটিশ পণ্য ও সেবা সেখানে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রবেশ করতে পারত।

২০২১ সালে কার্যকর হওয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তি শুল্ককে প্রায় শূন্য পর্যায়ে রাখলেও নতুন কাগজপত্র, সীমান্ত পরীক্ষা, স্বাস্থ্য সনদ এবং নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ যুক্ত করেছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের রপ্তানি প্রায় ১২ শতাংশ এবং আমদানি প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্ম’। বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি ও খাদ্যপণ্য খাত। এই খাতের রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ঝিনুক, কাঁকড়া ও সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানিকারকদের অনেকেই অতিরিক্ত সীমান্ত পরীক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসা ইউরোপীয় গ্রাহকদের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দিয়েছে, কারণ আগের তুলনায় সময়, খরচ ও ঝামেলা অনেক বেড়ে গেছে।

নতুন বাণিজ্য চুক্তি কেন যথেষ্ট নয়?

ব্রেক্সিট সমর্থকদের অন্যতম যুক্তি ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে এসে ব্রিটেন স্বাধীনভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে। গত দশ বছরে ব্রিটেন ৭২টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩৯টি বাণিজ্য চুক্তি করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এগুলি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষতি পূরণ করতে পারেনি। আজও ইউরোপ ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। দেশটির মোট বাণিজ্যের ৪০ শতাংশেরও বেশি ইউরোপের সঙ্গে হয়। অর্থাৎ ব্রেক্সিটের পরও ব্রিটেন ইউরোপীয় বাজারের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বাজেট রেসপনসিবিলিটি অফিস তাদের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ধরে নিয়েছে, ইউরোপের বাইরে নতুন চুক্তিগুলি অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

ব্যবসায়িক বিনিয়োগে ধাক্কা

ব্রেক্সিটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। গণভোটের পর কয়েক বছর ধরে ব্রিটিশ ব্যবসাগুলি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগেছে। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, কোন নিয়ম কার্যকর হবে, পণ্য চলাচল কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে।

পরে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে বটে, কিন্তু তা সম্ভাব্য মাত্রায় পৌঁছায়নি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ব্রেক্সিটজনিত অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ প্রায় ৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

অভিবাসন নিয়ে বাস্তবতা

ব্রেক্সিট সমর্থকদের আরেকটি প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল অভিবাসন কমানো।কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলির নাগরিকের সংখ্যা কমলেও অ-ইউরোপীয় দেশ থেকে অভিবাসন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে মোট অভিবাসনের সংখ্যা কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই বেড়েছে। এর ফলে শ্রমবাজারের কাঠামো বদলে গেছে। আতিথেয়তা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পরিচর্যার মতো খাতগুলো ইউরোপীয় শ্রমিক হারিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় ও কর্মী সংকটে পড়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সারা হলের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী অভিবাসন কাঠামোর পরিবর্তনের পূর্ণ প্রভাব বুঝতে আরও সময় লাগবে।

লন্ডন কি হারিয়েছে তার মর্যাদা?

ব্রেক্সিটের আগে আশঙ্কা ছিল, লন্ডন ইউরোপের আর্থিক রাজধানীর মর্যাদা হারাবে। সেই আশঙ্কা পুরোপুরি সত্য হয়নি। আজও লন্ডন ইউরোপের বৃহত্তম আর্থিক কেন্দ্র। কোনো একক শহর তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। তবে কিছু ব্যবসা অন্যত্র সরে গেছে। শেয়ারবাজারের কিছু লেনদেন আমস্টারডামে চলে গেছে, আর সম্পদ ব্যবস্থাপনার কিছু অংশ স্থানান্তরিত হয়েছে ডাবলিনে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি ছিল “ধীরে ধীরে বাতাস বেরিয়ে যাওয়া টায়ারের” মতো। বড় ধস নয়, কিন্তু ধারাবাহিক ক্ষয়।

আগামী দশকে কী হতে পারে?

ব্রিটেন বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিপুল সরকারি ঋণ এবং উচ্চ সুদের চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রেক্সিটের কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আলোচনা আবার জোরদার হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি ইউরোপীয় একক বাজারে পুনরায় যোগদান বা শুল্ক ইউনিয়নে ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ব্রিটেনের জন্য নতুন করে বড় ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহী নয়। ফলে আগামী কয়েক বছরে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। দশ বছর পর অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন স্পষ্ট—ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু হারানো আয় বা কমে যাওয়া বাণিজ্য নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো সেই সম্ভাবনাগুলি, যা আর বাস্তবায়িত হয়নি। যে বিনিয়োগ আসেনি, যে ব্যবসা তৈরি হয়নি, যে সুযোগগুলো হারিয়ে গেছে—সেগুলির মূল্য হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না। কিন্তু ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর তার প্রভাব গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles