Table of Contents
হাইলাইটস
- আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-র পরিদর্শকদের ফের দেশে ঢুকতে দিতে রাজি হয়েছে ইরান।
- এর বিনিময়ে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করা হবে।
- দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী।
- সুইৎজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে প্রায় ১৮ ঘণ্টার বৈঠকে অগ্রগতি।
- লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে নতুন ‘ডি-কনফ্লিকশন মেকানিজম’ গঠনের সিদ্ধান্ত।
- আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ মার্কিন-ইরান চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনীতিতে বড় মোড় এনে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা সামনে এসেছে। সুইৎজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে দীর্ঘ আলোচনার পর ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের ফের দেশে কাজ করার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। এর বদলে ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানির উপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে প্রস্তুত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীও পুনরায় খুলে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এই সমঝোতাকে ‘বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, এটি ইরানের সম্ভাব্য পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পথে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পরমাণু পরিদর্শকরা ফিরছেন
গত বছর ইজরায়েল ও আমেরিকার হামলার পর ইরান IAEA-র সঙ্গে সহযোগিতা কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। তেহরানের অভিযোগ ছিল, তাদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানা হয়েছে এবং পরমাণু স্থাপনাগুলির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে।এবার আলোচনার ফলস্বরূপ ইরান আবারও আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। যদিও ঠিক কতটা স্বাধীনভাবে তারা কাজ করতে পারবেন, কোন কোন স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারবেন এবং সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলিতে প্রবেশাধিকার কতটা থাকবে, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত আলোচনা বাকি।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র পরিদর্শনে সম্মত হবে এবং বিশ্ব নিশ্চিত হবে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ।”তবে তেহরান দাবি করেছে, তারা নতুন কোনও ছাড় দেয়নি। ইরানের বক্তব্য, যে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের উপর নির্ভর করবে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে আমেরিকা
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হল ইরানের তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মার্কিন প্রতিশ্রুতি।মার্কিন অর্থ দফতর ৬০ দিনের একটি বিশেষ ছাড়পত্র জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে ইরান আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট দ্রব্য বিক্রি করতে পারবে।বিশেষত চীন, যা ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা, সে দেশের সঙ্গে বাণিজ্য অনেক সহজ হবে। এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে বহু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লেনদেন করতে চাইত না। নতুন ব্যবস্থায় ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে অর্থ গ্রহণ করতে পারবে।বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ভুগছে দেশটি। তেল রপ্তানি বাড়লে সরকারের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
হরমুজ প্রণালী খুলছে
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহে এই প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল।ইরান অভিযোগ করেছিল যে লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ না হওয়ায় তারা আবারও হরমুজে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।তবে আলোচনার পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি কাতারি এলএনজি ট্যাঙ্কার এবং বড় তেলবাহী জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। এটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট দেখা দিতে পারত।
লেবাননকে ঘিরে নতুন উদ্যোগ
এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল লেবানন।ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল লেবাননে ইজরায়েলি হামলা বন্ধ করা। কারণ সেখানে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সক্রিয়।এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা, ইরান এবং লেবাননের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি নতুন ‘ডি-কনফ্লিকশন’ বা সংঘাত-প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।জেডি ভ্যান্সের ব্যাখ্যায়, অনেক সময় কোনও নিম্নস্তরের কমান্ডার অনুমতি ছাড়াই হামলা চালিয়ে দেয়, যার ফলে বড় সংঘাত তৈরি হয়। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে।তবে এই ব্যবস্থায় সরাসরি ইজরায়েল বা হিজবুল্লাহ অংশ নিচ্ছে না। ফলে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।
আলোচনার পথে বাধা
যদিও অগ্রগতি হয়েছে, তবু সমস্ত সমস্যা মিটে যায়নি।রবিবার আলোচনার মাঝেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক কঠোর মন্তব্যে ইরানি প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি নিয়ে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান।তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেঙে পড়েনি। উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে যে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার বিকল্প নেই।ভ্যান্স পরে বলেন, “কিছুটা হুমকি, কিছুটা অভিযোগ ছিল। কিন্তু দিনের শেষে আমরা বড় অগ্রগতি করেছি।”
৬০ দিনের কঠিন পরীক্ষা
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে কতটা অগ্রগতি সম্ভব হবে।কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।একই সঙ্গে কাতারে আটকে থাকা ইরানের সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের কিছু অংশ ধাপে ধাপে ইরানের হাতে ফিরতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
এই সমঝোতা এখনও চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার সূচনা। তবু গত কয়েক বছরের সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে এটিকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।যদি ইরান সত্যিই আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে চলে, তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হয় এবং হরমুজ প্রণালী খোলা থাকে, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিও এর সুফল পেতে পারে।তবে চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের উপর—লেবাননে ইজরায়েলি অভিযান কত দ্রুত থামে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের নতুন এই বরফ গলা কতটা স্থায়ী হয়। এখন সেই পরীক্ষার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল।