হাইলাইটস:

  • ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
  • অধিকাংশ দেশ বাড়তি দামে তেল কিনতে বাধ্য হলেও চীন তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে রয়েছে।
  • বিশাল কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুতের কারণে বেইজিং তাৎক্ষণিক চাপ এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
  • বিশ্লেষকদের মতে, চীনের হাতে প্রায় ১.২ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে।
  • এই মজুত শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, আন্তর্জাতিক তেলবাজারে চীনের দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়িয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান-ইজরায়েল সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বে যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়, তার একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই পথ নিয়ে সামান্য আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যখন ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা উন্নয়নশীল বহু দেশ সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন, তখন চীন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নিশ্চিন্ত অবস্থানে রয়েছে।

এর প্রধান কারণ, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে বেইজিং সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে তার কৌশলগত ভান্ডার এবং বাণিজ্যিক সংরক্ষণাগার পূর্ণ করেছে। ফলে আজকের সংকটের সময় চীনের হাতে রয়েছে এক বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনী।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তবুও দেশের শোধনাগারগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ প্রয়োজনীয় ঘাটতির একটি অংশ মেটানো হয়েছে পূর্বে সঞ্চিত মজুত থেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের এই অবস্থান হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বেইজিং উপলব্ধি করেছিল যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার জন্য অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয় বিশাল কৌশলগত পেট্রোলিয়াম ভান্ডার। বর্তমানে সরকারি ও বাণিজ্যিক মজুত মিলিয়ে চীনের হাতে প্রায় ১.২ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুমান।

এই বিপুল মজুতের ফলে চীন তাৎক্ষণিক বাজার আতঙ্কের শিকার হয় না। যখন তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন তারা কিছু সময়ের জন্য আমদানি কমিয়ে সংরক্ষিত তেলের ওপর নির্ভর করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে তেল কিনতে বাধ্য হওয়ার চাপ কমে।

অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ এবং এশিয়ার কয়েকটি বড় আমদানিকারক রাষ্ট্রের কাছে এত বড় মজুত নেই। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তাদের দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়। এতে দাম আরও বাড়ে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়।

চীনের আরেকটি সুবিধা হলো তার দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি। রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্কের কারণে বেইজিং একাধিক উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে পারে। ফলে কোনও একটি অঞ্চলে সংকট তৈরি হলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চীন সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। দেশটির অর্থনীতি এখনও বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে যায় অথবা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তাহলে চীনের ওপরও প্রভাব পড়বে। কিন্তু অন্যদের তুলনায় সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি।

আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। ভবিষ্যতের বিশ্বে শুধু তেল উৎপাদন নয়, তেল সংরক্ষণের ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চীন বহু বছর ধরে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। আজ যখন বিশ্বের বহু দেশ সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন বেইজিংয়ের ভরা ট্যাঙ্কগুলো সেই দূরদর্শী নীতিরই ফল।

বর্তমান তেল সংকট তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা বাজারের অস্থিরতার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কৌশলগত মজুত এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন কীভাবে নিজেকে বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত অবস্থায় নিয়ে গেছে। আর সেই কারণেই বিশ্ব যখন তেলের জন্য হন্যে হয়ে উঠছে, তখন চীন অপেক্ষাকৃত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারছে।