হাইলাইটস:
- ইরানের সঙ্গে সমঝোতাকে বড় সাফল্য বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমেছে।
- হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে জ্বালানি সংকট কিছুটা কমতে পারে।
- উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলির প্রবৃদ্ধি বড় ধাক্কা খেয়েছে, মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে।
- অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধের প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সঙ্গে সদ্য হওয়া সমঝোতাকে নিজের বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভার্সাই প্রাসাদে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বাজারের মতো বুদ্ধিমান আর কিছু নেই, আর বাজার এই চুক্তিকে ভালোবাসছে।” তাঁর দাবি, এই সমঝোতা না হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার দিকে চলে যেত।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও অনেক বেশি জটিল। সপ্তাহান্তে সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা হঠাৎ বাতিল হয়ে যায়, পরে আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। একই সময়ে ইরান জানায়, জর্ডানে ইজরায়েলি হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ রাখার যথেষ্ট কারণ তাদের রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যায়। তাই এটি পুরোপুরি খুলে গেলে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে এবং জেট জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সম্ভাব্য ঘাটতি এড়ানো সম্ভব হবে। বাজারও সেই আশাতেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সমঝোতার ঘোষণার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধের শুরুর পর প্রথম।
কিন্তু তেলের দাম কমা মানেই অর্থনৈতিক সংকট শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাব ভিন্নভাবে পড়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের প্রধান আয়ের উৎস তেল রপ্তানি দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলারও শিকার হতে হয়েছে। অক্সফোর্ড ইকনমিকসের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন ২.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আমেরিকা এখন নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তি সংস্থাগুলির বাজারে প্রবেশ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। তবু সাধারণ আমেরিকানদের ওপর চাপ বেড়েছে। এক বছরে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি এক ডলার বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ট্রাম্পের নতুন ফেডারেল রিজার্ভ প্রধান কেভিন ওয়ার্শকে নিয়োগ দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সুদের হার কমানো। কিন্তু পরিস্থিতি এখন উল্টো দিকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার একাধিকবার বাড়াতে হতে পারে।
ইউরোপেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপীয় ইউনিয়নে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। সেই কারণে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৩ সালের পর প্রথমবার সুদের হার বাড়িয়েছে। ব্রিটেনে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও ভোক্তাদের আস্থা দুর্বল হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের বাজারে চাপ বাড়ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলির অবস্থা আরও কঠিন। অনেক দেশ জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। সার উৎপাদনের খরচও বেড়ে যাওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে নতুন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাহিদা কমে যাওয়ার কারণেই তেলের দাম আরও বেশি বাড়েনি।
চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের ধারণা, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ কৌশলগত তেল মজুত করে রেখেছিল। সেই মজুত ব্যবহার করেই তারা সরবরাহ সংকটের ধাক্কা অনেকটা সামলে নিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক কিছুটা কমেছে।
তবু অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও তার আর্থিক অভিঘাত এত দ্রুত মুছে যাবে না। অক্সফোর্ড ইকনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ রায়ান সুইটের মতে, সামরিক সংঘর্ষের সময়সীমা আর অর্থনৈতিক প্রভাবের সময়সীমা এক নয়। যুদ্ধ থেমে গেলেও এর প্রভাব চলতি বছরজুড়ে এবং সম্ভবত আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত অনুভূত হবে।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। সেটি খুললেও ইরান ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন ফি বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে। ফলে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়ে গেছে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে যে তেহরান তার পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না, তাহলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। মার্কিন রাজনীতিতেও চুক্তি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে, এমনকি রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও আপত্তির সুর শোনা যাচ্ছে।
ক্যাপিটাল ইকনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং মনে করেন, এই সমঝোতাকে স্থায়ী শান্তি চুক্তি হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাঁর মতে, লেবাননে ইজরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশল এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ—এই তিনটি কারণ যেকোনো সময় সমঝোতাকে ভেঙে দিতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক আরও একধাপ এগিয়ে সতর্ক করছেন যে, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবারও সংঘর্ষ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের অনুমান, আগামী দেড় বছরের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা এখনও যথেষ্ট বেশি।
এমনকি যুদ্ধ আর না হলেও একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থেকে যাবে। এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরান চাইলে মুহূর্তের মধ্যে উপসাগরীয় তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বহু সংস্থা ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মজুত রাখবে, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যয় করবে। এর অর্থ হলো জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম স্থায়ীভাবে কিছুটা বেশি থেকে যেতে পারে।
অর্থাৎ, ট্রাম্প যে দ্রুত অর্থনৈতিক স্বস্তির ছবি আঁকছেন, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি হয়তো তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ঠেকিয়েছে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যে দীর্ঘ ছায়া পড়েছে, তা এখনও কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই সংঘাতের প্রকৃত মূল্য আগামী বহু মাস ধরে বিশ্বকে দিতে হতে পারে।