হাইলাইটস
- দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের তলদেশে আবিষ্কৃত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তিমির ‘নেক্রোপলিস’ বা কবরস্থান।
- প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চলে মিলেছে শত শত তিমির হাড়গোড়।
- কিছু অবশেষ কয়েক মিলিয়ন বছর পুরনো, আবার কিছু তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক।
- বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন আগে অজানা একটি তিমি প্রজাতির জীবাশ্ম।
- মৃত তিমির দেহাবশেষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অভিনব গভীর-সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র।
ঊনবিংশ শতকে স্কটিশ অভিযাত্রী David Livingstone ‘হাতির কবরস্থান’-এর কিংবদন্তিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ধারণাটি ছিল, বৃদ্ধ হাতিরা মৃত্যুর আগে একটি নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়। পরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে মূলত কল্পকাহিনি বলে প্রমাণ করেছে। কিন্তু এবার সেই কিংবদন্তির আধুনিক সামুদ্রিক সংস্করণ যেন বাস্তবের মাটিতে—অথবা বলা ভালো, সমুদ্রের অতলে—রূপ নিতে শুরু করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের গভীরে বিজ্ঞানীরা এমন একটি এলাকা আবিষ্কার করেছেন, যেখানে শত শত তিমির হাড়গোড় ছড়িয়ে রয়েছে। গবেষকদের ভাষায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম, গভীরতম এবং প্রাচীনতম তিমি ‘নেক্রোপলিস’ বা মৃতদেহ-সমাধিক্ষেত্র।
গবেষণাটি সম্প্রতি Nature পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে চীন, ইতালি এবং নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে ভারত মহাসাগরের ডায়ামান্টিনা ফ্র্যাকচার জোন নামে পরিচিত একটি বিশাল ভূতাত্ত্বিক ফাটল বরাবর অন্তত ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে তিমির অবশেষ জমা হয়েছে।
এই অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। প্রায় ৫ কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া আলাদা হয়ে যাওয়ার ফলে এই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রতল সম্পর্কে আরও জানার উদ্দেশ্যে পরিচালিত ‘গ্লোবাল হ্যাডাল এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রাম’-এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনা সাবমার্সিবল ফেনদৌঝে এই অঞ্চলে অনুসন্ধান চালায়।
প্রথমে একটি মৃত তিমির দেহাবশেষ দেখা যায় ক্যামেরায়। কিন্তু এরপর যা মিলল, তা গবেষকদেরও বিস্মিত করে। ছয় সপ্তাহ ধরে ৩২টি ডুব অভিযানে মোট ৪৮৫টি হাড় শনাক্ত করা হয়। এত গভীর সমুদ্রে এত বিপুল পরিমাণ তিমির অবশেষ এর আগে কখনও দেখা যায়নি।
অবশেষগুলির মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বেলিন তিমি—যেমন সেই তিমি, অ্যান্টার্কটিক মিনকে তিমি এবং কমন মিনকে তিমি। পাশাপাশি পাওয়া গেছে বহু ‘বিকড হোয়েল’-এর হাড়, যাদের জীবন কাটে গভীর সমুদ্রে এবং যাদের দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিরল। বর্তমানে এ ধরনের মাত্র ২৫টি প্রজাতি পরিচিত, যার মধ্যে কয়েকটিকে ইতিহাসে মাত্র একবারই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
আরও বড় চমক আসে জীবাশ্ম বিশ্লেষণে। গবেষকরা একটি খুলির সন্ধান পান, যা বিলুপ্ত বিকড তিমি Pterocetus benguelae-এর বলে চিহ্নিত হয়েছে। এর বয়স প্রায় ৫৩ লক্ষ বছর। এটিই সংগ্রহে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা।
এর পাশাপাশি আরেকটি জীবাশ্ম খুলির সন্ধান মেলে, যা আগে বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল। নতুন প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে Pterocetus diamantinae। অর্থাৎ এই আবিষ্কার শুধু প্রাচীন জীবনের ইতিহাসই সমৃদ্ধ করেনি, নতুন প্রজাতির অস্তিত্বের প্রমাণও দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, হাড়গুলির অস্বাভাবিক ঘনত্ব এবং তাদের ওপর জমে থাকা ফেরোম্যাঙ্গানিজের আবরণ এগুলিকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সংরক্ষিত রেখেছে। যেন প্রকৃতি নিজেই তাদের জন্য একটি পাথুরে কফিন তৈরি করে দিয়েছে।
এই ‘তিমি কবরস্থান’-এর মাঝখানে পাওয়া গেছে পাঁচটি অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক মৃতদেহ। আর সেই মৃতদেহগুলিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিস্ময়কর জীবজগত। জেলিফিশ, ব্রিটল স্টার, ঝিনুক, সামুদ্রিক শামুক এবং মৃতদেহভোজী কৃমির বিশাল সমাবেশ দেখা গেছে সেখানে। প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ২,৮৪০টি প্রাণীর উপস্থিতি নথিবদ্ধ করেছেন গবেষকরা।
গবেষকদের ধারণা, এই প্রাণীদের অনেকগুলিই এখনও বিজ্ঞানের অজানা। ফলে ভারত মহাসাগরের এই অতল অঞ্চল শুধু তিমির মৃত্যুর ইতিহাস নয়, গভীর সমুদ্রের নতুন জীববৈচিত্র্যেরও এক বিশাল ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে।
এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর গভীর সমুদ্র এখনও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। মানুষের চাঁদে যাওয়ার ইতিহাস যতই পুরনো হোক, সমুদ্রের অতল অন্ধকারে এখনও লুকিয়ে আছে এমন সব রহস্য, যা মাঝে মাঝে উঠে এসে বিজ্ঞানের পরিচিত মানচিত্রকেই বদলে দেয়। ভারত মহাসাগরের এই ‘তিমির নেক্রোপলিস’ সেই রহস্যময় জগতেরই এক অসাধারণ জানালা।