হাইলাইটস:
- প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগের জেরে বাতিল হওয়া নিট-ইউ জি পরীক্ষা ফের অনুষ্ঠিত হল দেশজুড়ে।
- প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
- নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
- পরীক্ষাকেন্দ্রে বসানো হয় ১.৩৮ লক্ষের বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা।
- মোতায়েন ছিল আড়াই লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী ও সরকারি কর্মী।
- ইলেকট্রনিক জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়েছে ৫১ হাজারের বেশি সিগন্যাল জ্যামার।
- সরকার ও জাতীয় পরীক্ষণ সংস্থা (NTA) দাবি করেছে, এবার পরীক্ষা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দেশের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-ইউ জি-কে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে চলা বিতর্ক, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং আইনি টানাপোড়েনের পর শনিবার দেশজুড়ে পুনরায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হল কঠোর নিরাপত্তার বলয়ের মধ্যে। জাতীয় পরীক্ষণ সংস্থা (NTA) এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা দেশের পরীক্ষার ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন রাজ্যে তদন্তে নেমেছিল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি। বহু পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদ দাবি করেছিলেন যে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে আবার পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। সেই প্রেক্ষাপটেই এবার লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী আবার পরীক্ষার আওতায় এসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার পরীক্ষাকেন্দ্র তৈরি করা হয়। সকাল থেকেই পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির বাইরে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই কেন্দ্রে পৌঁছতে বলা হয়েছিল, যাতে নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট সময় থাকে।
এবারের পরীক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে মোট ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৫৬০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রবেশদ্বার, করিডর, পরীক্ষাকক্ষ, প্রশ্নপত্র সংরক্ষণাগার—সব জায়গাই ছিল নজরদারির আওতায়। অনেক কেন্দ্রে সরাসরি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়, যাতে কোনও ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
এর পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে ৫১ হাজার ৩১১টিরও বেশি সিগন্যাল জ্যামার। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্লুটুথ ডিভাইস, গোপন ইয়ারপিস কিংবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির চারপাশে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে জ্যামার বসানো হয়। ফলে পরীক্ষার সময় মোবাইল বা অন্যান্য বেতার যোগাযোগ কার্যত অচল ছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিপুল সংখ্যক জনবল মোতায়েন। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসনের সমন্বয়ে আড়াই লক্ষেরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী, পর্যবেক্ষক, পরীক্ষা-পরিচালক এবং সরকারি কর্মী কাজ করেছেন। অনেক সংবেদনশীল কেন্দ্রে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায়। প্রশ্নপত্র পরিবহণ থেকে শুরু করে উত্তরপত্র সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গত কয়েক মাসে একাধিক রাজ্যে গ্রেফতারি হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিক্রির চেষ্টা চলছিল। সেই কারণেই এবার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক স্তর যুক্ত করা হয়। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, জিপিএস-সক্ষম পরিবহণ ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময়ে প্রশ্নপত্র খোলার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পরীক্ষার্থীদের জন্যও নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছিল। প্রবেশপত্রের সঙ্গে পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়। বায়োমেট্রিক যাচাই, মুখের ছবি মিলিয়ে দেখা এবং ধাতব বস্তু শনাক্তকারী যন্ত্রের মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হয়। পরীক্ষার্থীদের গয়না, স্মার্ট ঘড়ি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের পোশাক পরেও কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
যদিও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অধিকাংশ অভিভাবক স্বাগত জানিয়েছেন, তবুও পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। বহু পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের মধ্যে আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ ছিল না। কেউ কেউ বলেছেন, প্রথম পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতেই হঠাৎ আবার পরীক্ষার সিদ্ধান্ত তাঁদের পরিকল্পনা ও মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।
তবে সরকারের বক্তব্য, দেশের মেডিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য ভর্তি প্রক্রিয়ার উপর। তাই কোনও ধরনের অনিয়মের সন্দেহ থাকলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। শিক্ষা মন্ত্রকের একাধিক শীর্ষকর্তা দাবি করেছেন, এবারের পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
জাতীয় পরীক্ষণ সংস্থাও জানিয়েছে, পরীক্ষা পরিচালনায় এবার নতুন কিছু প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলির সঙ্গে রিয়েল-টাইম যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যবেক্ষকদের ডিজিটাল রিপোর্টিং এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত করতে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থার দাবি, এই পদক্ষেপগুলি ভবিষ্যতের জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলির জন্যও একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুনরায় পরীক্ষা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; পরীক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও জরুরি। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, পরিবহণ, সংরক্ষণ এবং পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
এখন নজর ফলপ্রকাশের দিকে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এবং তাঁদের পরিবার আশা করছেন, দীর্ঘ বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার পর এবার অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। দেশের মেডিক্যাল শিক্ষায় প্রবেশের প্রধান দরজা হিসেবে নিট ইউজির বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করাই এখন শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।