হাইলাইটস
- প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চিন বেছে নিলেন তারেক রহমান।
- সফরের মূল লক্ষ্য বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
- চিন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
- বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক নথি সই হওয়ার সম্ভাবনা।
- তিস্তা প্রকল্প ও মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।
- ভারতের পরিবর্তে অন্য দুই এশীয় শক্তিকে প্রথম সফরের গন্তব্য করা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জল্পনা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া এবং চিনকে বেছে নিয়ে স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রথা ছিল, বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানেরা প্রথম বা প্রথমদিকের বিদেশ সফরে ভারতকে অগ্রাধিকার দেন। সেই প্রথা থেকে সরে এসে তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত ঢাকায় যেমন আলোচনার বিষয় হয়েছে, তেমনই নজর কেড়েছে নয়াদিল্লি, বেজিং এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক মহলেও।
রবিবার শুরু হওয়া সফরের প্রথম পর্বে তিনি দু’দিনের জন্য মালয়েশিয়া যাবেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। মালয়েশিয়া বহু বছর ধরেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম বড় গন্তব্য। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমবাজারে নানা জটিলতা দেখা দিলেও ঢাকা চাইছে সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত করতে। ফলে সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।
মালয়েশিয়া সফর শেষে তারেক রহমান চার দিনের জন্য চিনে যাবেন। এই সফরকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, সেখানে তিনি শুধু দ্বিপাক্ষিক বৈঠকই করবেন না, অংশ নেবেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এ, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিত। বিশ্বের বহু শীর্ষ ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক এবং বিনিয়োগকারী এই সম্মেলনে অংশ নেন।
চিন সফরের অন্যতম আকর্ষণ হবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই সফরে বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক নথি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), একটি কর্মপরিকল্পনা এবং আরও কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা নদীর খনন, ড্রেজিং এবং নদীতীর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুঁজছিল। চিন ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; উত্তর বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক হবে।
এছাড়া মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণে চিনা অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা হবে। চট্টগ্রামের পর মোংলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর। এটিকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসতে পারে। চিনের বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে ঢাকা।
তবে সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হল ভারতের অনুপস্থিতি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের তালিকায় নয়াদিল্লির জায়গা না পাওয়া অনেকের কাছে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই ধরা পড়ছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নতুন সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সেই কারণেই কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় দেশগুলিকে আগে বেছে নেওয়া হয়েছে। অন্য অংশের মতে, এর মাধ্যমে ঢাকা দেখাতে চাইছে যে তারা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং কোনও একক শক্তির উপর নির্ভরশীল থাকবে না।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এই সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিদেশযাত্রা নয়। এটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। মালয়েশিয়া ও চিনে আলোচনার ফলাফল কতটা বাস্তব সাফল্যে পরিণত হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলের।