হাইলাইটস:

  • ট্রাম্পের ইরান-চুক্তি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে কঠিন রাজনৈতিক অবস্থায় ফেলেছে।
  • প্রকাশ্যে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন।
  • আমেরিকা দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে, কিন্তু ইজরায়েল এখনও নিরাপত্তা-ঝুঁকির কথা বলছে।
  • দক্ষিণ লেবানন ও হিজবুল্লাহ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে ফাটল স্পষ্ট।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ এখন “দ্বিমুখী রাস্তায়” এসে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যেমন নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, তেমনই আমেরিকা ও ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিয়েছে। একসময় যাঁকে ওয়াশিংটনে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদেশি নেতা হিসেবে দেখা হতো, সেই বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে এখন ক্রমশ একা লড়াই করার সম্ভাবনার মুখে পড়তে হচ্ছে।

চুক্তির খবর প্রকাশের পর একদিনেরও বেশি সময় নীরব থাকার পর নেতানিয়াহু সংবাদ সম্মেলনে মুখ খোলেন। সেখানে তিনি সচেতনভাবেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা এড়িয়ে যান। বরং বলেন, “কিছু বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমার মত এক নয়। আমি ইজরায়েলের নিরাপত্তার জন্য দায়ী, এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

এই মন্তব্যই অনেকের কাছে সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতীক।

মাত্র চার মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তখন নেতানিয়াহুর উপস্থাপিত গোয়েন্দা তথ্য ও যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসের অগ্রাধিকার বদলাতে শুরু করে। এখন ট্রাম্পের লক্ষ্য যুদ্ধের দ্রুত অবসান এবং কূটনৈতিক সমাধান।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় দিক হল ট্রাম্পের প্রকাশ্য ভাষা। এক সময় যাঁকে তিনি সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে বর্ণনা করতেন, সেই নেতানিয়াহুকে নিয়ে এখন ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া কথোপকথনে ট্রাম্প নাকি বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুর উপর “অত্যন্ত বিরক্ত” এবং তাঁর “বিচারবুদ্ধির অভাব” রয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইজরায়েলের লেবানন অভিযানকে সমালোচনা করেছেন। তাঁর কথায়, “প্রতিবার কাউকে খুঁজতে গিয়ে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভেঙে ফেলতে হবে না। সেখানে থাকা সবাই হিজবুল্লাহ নয়।”

মার্কিন কোনও প্রেসিডেন্টের মুখে এমন ভাষা খুবই বিরল।

বিশিষ্ট কূটনীতি-বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, “কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনও কোনও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে এভাবে কথা বলেননি। ব্যক্তিগত কথোপকথনের এত কটাক্ষপূর্ণ অংশও আগে কখনও প্রকাশ্যে আসেনি।”

চুক্তির রাজনৈতিক দিকও নেতানিয়াহুর জন্য সমস্যার। ইরানের কয়েকশো কোটি ডলারের স্থগিত সম্পদ মুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিদ্রূপের বিষয়, ২০১৫ সালের ওবামা প্রশাসনের পরমাণু চুক্তির সময় ট্রাম্প নিজেই এই ধরনের আর্থিক সুবিধার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। এখন তিনি নিজেই আলোচনার মাধ্যমে অনুরূপ ব্যবস্থা বিবেচনা করছেন।

লেবানন প্রশ্নেও দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। ইরান ও আমেরিকা উভয়েই হিজবুল্লাহ-ইজরায়েল সংঘাতের অবসানের কথা বলছে। কিন্তু ইজরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের সেনা অবস্থান বজায় থাকবে।

ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও সূক্ষ্ম। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইজরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার থাকবে, কিন্তু সেটি কোনও “ফাঁকা চেক” নয়। অর্থাৎ ইচ্ছামতো সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

নেতানিয়াহুর সমস্যা এখানেই। তিনি গাজা, লেবানন ও ইরান—তিনটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই এমন কোনও স্পষ্ট বিজয় দেখাতে পারেননি যা দেশের ভোটারদের সন্তুষ্ট করবে। বিদেশি মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হলে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

অন্যদিকে, আমেরিকা এখন উপসাগরীয় দেশগুলি এবং পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের উপর নির্ভর করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ফলে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার আর তেল আভিভের অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ারের ভাষায়, “আমরা এখন এক দ্বিমুখী রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যে সামরিক পরিকল্পনার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন, তা দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। এখন ট্রাম্প যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যুদ্ধ শেষ করতে চান।”

আয়ারের মতে, আমেরিকার জন্য এটি একটি কৌশলগত অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও ইজরায়েলের জন্য বিষয়টি এখনও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তবে নেতানিয়াহুকে এখনও শেষ বলে ধরে নিতে রাজি নন অনেক পর্যবেক্ষক। চুক্তির পূর্ণ শর্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি। তিনি হয়তো আশা করছেন, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে মতভেদ এতটাই বাড়বে যে চুক্তি ভেঙে পড়বে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ইরান–আমেরিকা আলোচনায় এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—ট্রাম্পের নতুন কূটনৈতিক পথচলা আমেরিকা–ইজরায়েল সম্পর্ককে এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দুই দেশের স্বার্থ আর পুরোপুরি অভিন্ন নয়। বহু দশকের ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যার প্রভাব শুধু ইরান বা লেবানন নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেই পড়তে পারে।